বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্সে বড় ধরনের নিরাপত্তা লঙ্ঘনের পর গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলনের চাপ কমতে শুরু করেছে। গত সপ্তাহে প্ল্যাটফর্মটি থেকে ৬৩০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ চুরির ঘটনার পর সাময়িকভাবে সেবা ব্যাহত হলেও আবারও কার্যক্রম শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার পর বাইন্যান্স থেকে গ্রাহকেরা ৩৬৪ কোটি ডলারের সম্পদ তুলে নিয়েছেন, যা প্রতিষ্ঠানটির মোট সম্পদের প্রায় ২ দশমিক ১ শতাংশ। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যাপক অর্থ উত্তোলনের প্রবণতা দেখা গেলেও বর্তমানে তা স্থিতিশীল হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাইন্যান্স। একই সময়ে প্ল্যাটফর্মটিতে নতুন করে অর্থ জমার পরিমাণও উল্লেখযোগ্য রয়েছে।
বাইন্যান্স জানিয়েছে, গত ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত তাদের ব্যবস্থাপনায় মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৭১০ কোটি ডলার। বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩৩ কোটি ৫০ লাখ।
নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনায় চুরি হওয়া সম্পদের ৯৫ শতাংশ ইতোমধ্যে নিজেদের অর্থ ব্যয় করে বিকল্প টোকেন কেনার মাধ্যমে পূরণ করেছে বাইন্যান্স। বাকি ৫ শতাংশ সম্পদ তুলনামূলক কম তারল্যসম্পন্ন হওয়ায় সেগুলো সংগ্রহ করতে আরও সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে শুক্রবার ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ার পর সপ্তাহান্তে বিটকয়েনের দাম কিছুটা পুনরুদ্ধার হয়েছে। সোমবার এর দাম ৭৮ হাজার ডলারের ওপরে লেনদেন হয়েছে। অন্যদিকে, ইথারের দামও শুক্রবার দুই মাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ার পর কিছুটা বেড়ে ২ হাজার ২৮৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
ক্রিপ্টো বিশ্লেষকদের মতে, বাইন্যান্সের নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত শুক্রবার বিটকয়েনভিত্তিক স্পট এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড থেকে ৬৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার প্রত্যাহার করা হয়েছে, যা অক্টোবরের মধ্যে এক দিনে সর্বোচ্চ। একই সময়ে ১৩০ কোটি ডলারের বেশি লিভারেজভিত্তিক বিনিয়োগ বাতিল হয়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্লকচেইন বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবসের নীতিবিষয়ক প্রধান অ্যারি রেডবোর্ড বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য এ ধরনের ঘটনা উদ্বেগজনক। কারণ, কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সাইবার হামলা হলে সাধারণত ব্যবহারকারীর তথ্য চুরির ঝুঁকি থাকে। কিন্তু ক্রিপ্টো বিনিময় প্ল্যাটফর্মে হামলার ফলে ইন্টারনেটের গতিতেই বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া সম্ভব।
বাইন্যান্স জানিয়েছে, ব্যবহারকারীদের চাহিদা বিবেচনায় ধাপে ধাপে অর্থ উত্তোলনের সুবিধা চালু করা হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে বিটকয়েন, ইথার, ডজকয়েন এবং ইউএসডিসি ও ইউএসডিটি স্টেবলকয়েন-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি টোকেনসহ মোট ১৫টি ক্রিপ্টো সম্পদ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, গত এক সপ্তাহে ব্যবহারকারীদের চাহিদার তথ্য বিশ্লেষণ করে কোন টোকেনের উত্তোলন আগে চালু করা হবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে বলেও গ্রাহকদের আশ্বস্ত করেছে তারা।
তবে ক্রিপ্টো বিশ্লেষণ প্ল্যাটফর্ম ডিফাইএললামার তথ্য অনুযায়ী, বাইন্যান্স থেকে অর্থের নিট বহিঃপ্রবাহের পরিমাণ ৫৮১ কোটি ডলার, যা তাদের আগের হিসাবে ছিল ৪৩৬ কোটি ডলার। এ বিষয়ে বাইন্যান্সের এক মুখপাত্র জানান, নিজেদের নতুন হট ওয়ালেটে স্থানান্তর করা অর্থ ডিফাইএললামার হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে ওই পরিসংখ্যান পুরোপুরি নির্ভুল নয়।
এদিকে এশিয়া ওয়েবথ্রি এআই অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে কোহ জানিয়েছেন, তিনি বাইন্যান্সে থাকা নিজের সম্পদ তুলে নেননি। কারণ, তার অধিকাংশ সম্পদ এমন একটি কোল্ড ওয়ালেটে সংরক্ষিত, যা এই হামলার আওতায় পড়েনি। তবে ঝুঁকি কমাতে বিনিয়োগকারীদের সম্পদের পরিমাণ পর্যালোচনা এবং একাধিক প্ল্যাটফর্মে সম্পদ সংরক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
বাইন্যান্সে সাইবার হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হ্যাকার গোষ্ঠী ট্রেডারট্রেইটারের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই।
শনিবার এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, চুরি করা ক্রিপ্টো সম্পদ ইথারে রূপান্তর করছেন ওই গোষ্ঠীর সদস্যরা। এসব সম্পদ বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে আরও গোপন উপায়ে স্থানান্তরের চেষ্টা হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছে এফবিআই।
যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস ও চেইনঅ্যানালাইসিসও হামলায় উত্তর কোরিয়ার সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত দিয়েছে। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার রাতের দিকে প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যে চুরির বড় অংশ সম্পন্ন হয়। এর সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে আগে ওঠা বড় ধরনের সাইবার হামলার অভিযোগের মিল রয়েছে।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ ঘটনায় উত্তর কোরিয়ার সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করেননি। শনিবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়া রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে দেশটি জড়িত থাকলে বিষয়টি নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.