দেশীয় বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম শিল্পের বিকাশ, আমদানি নির্ভরতা হ্রাস ও রপ্তানি সম্প্রসারণে সরকারের নীতি সহায়তা চেয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, যৌক্তিক শুল্ক কাঠামো, সরকারি ক্রয়ে দেশীয় পণ্যের অগ্রাধিকার, আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার স্থাপন এবং প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন নিশ্চিত করা গেলে দেশের ট্রান্সফরমার, সুইচগিয়ার ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম শিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রান্সফরমার্স অ্যান্ড সুইচগিয়ার্সের (বিম্যাটস) প্রথম বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। রাজধানীর রেডিসন ব্লু ঢাকা ওয়াটার গার্ডেন হোটেলের উৎসব হলে ‘পাওয়ার-আপ বাংলাদেশ: থ্রু ইমপোর্ট সাবস্টিটিউশন অ্যান্ড গ্রোয়িং এক্সপোর্ট উইথ ইলেকট্রিক্যাল ইকুইপমেন্ট—মেইড ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এতে মিডিয়া স্পন্সর ছিল বাছাড় ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড।
বিম্যাটসের সভাপতি প্রকৌশলী আলী আজমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবু সায়েদ মো. কামরুজ্জামান। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম। অনুষ্ঠানে বাছাড় ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক উজ্জ্বল কান্তি বাছাড়ও উপস্থিত ছিলেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী। অডিও-ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনার মাধ্যমে তিনি দেশের বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন, দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং নীতিগত চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা তুলে ধরেন।
বিম্যাটসের সভাপতি প্রকৌশলী আলী আজম বলেন, দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া এবং ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের প্রসার কেবল বাণিজ্যিক বিষয় নয়, বরং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের অন্যতম শর্ত। তাঁর মতে, যথাযথ সরকারি নীতি সহায়তা, কর কাঠামোর যৌক্তিকীকরণ ও পণ্যের মান পরীক্ষার সনদ পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও জ্বালানি খাতে প্রবৃদ্ধির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার স্থাপন এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা প্রয়োজন। কার্যকর নীতিমালার মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে বিদ্যুৎ খাতকে শক্তিশালী রপ্তানিমুখী শিল্পে রূপান্তর করা সম্ভব।
প্রধান অতিথি মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, দেশীয় শিল্পের বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক মানের পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের মূলধন দেশেই ধরে রাখা সময়ের দাবি। মানসম্পন্ন গবেষণাগার স্থাপন, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং সরকারি ক্রয়ে গুণগত মানসম্পন্ন দেশীয় পণ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে সরকার ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সেমিনারে বিম্যাটসের সহসভাপতি প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আল জিলানী সংগঠনটির কার্যক্রম এবং সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তার বিষয়ে একটি তথ্যচিত্র উপস্থাপন করেন। এতে দেশের ট্রান্সফরমার, সুইচগিয়ার ও বৈদ্যুতিক প্যানেলের বাজার পরিস্থিতি এবং দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতার চিত্র তুলে ধরা হয়।
বক্তারা জানান, দেশে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের বাজারের আকার প্রায় ৪৭৫ কোটি ডলার। এর প্রায় ৭৫ শতাংশ চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। অথচ বিম্যাটসের ৩৩টি সদস্য প্রতিষ্ঠানসহ শতাধিক দেশীয় প্রতিষ্ঠান এসব পণ্য উৎপাদন করছে। দেশীয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে ভারত, নেপাল, তানজানিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি দেশসহ আটটি দেশে ২ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে।
তাঁরা আরও জানান, বৈশ্বিক বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের বাজারের বর্তমান আকার প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার, যা আগামী ১০ বছরে বেড়ে ৯০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকারি ক্রয়ে দেশীয় পণ্যের মূল্য অগ্রাধিকার, কাঁচামাল আমদানিতে কম শুল্ক এবং জাতীয় পর্যায়ে মান পরীক্ষার পরীক্ষাগার স্থাপন জরুরি।
বক্তাদের উপস্থাপিত প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা পাওয়া গেলে আগামী ১০ বছরে দেশীয় বাজারে আমদানিনির্ভরতা ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব। একই সময়ে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম রপ্তানি বছরে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারে উন্নীত করা এবং প্রায় ১ হাজার ৪৩০ কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের পর উন্মুক্ত প্যানেল আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিদ্যুৎ বিভাগ, বিপিডিবি, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি), পাওয়ার সেল, বিপিপিএ, প্রধান বিদ্যুৎ পরিদর্শকের কার্যালয় এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিম্যাটসের সাধারণ সম্পাদক উৎপল কুমার দাস। সমাপনী বক্তব্যে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সংগঠনটির সিনিয়র সহসভাপতি প্রকৌশলী মো. রবিউল আলম।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.