৬২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজে বিতরণ ১৯ শতাংশ

অর্থনীতি চাঙা করা, বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত ৬২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ বিতরণে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। ঘোষণার প্রায় পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও এ তহবিল থেকে বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ১১ হাজার ৯৫৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ। ফলে প্যাকেজের ৮০ শতাংশের বেশি অর্থ এখনো বিতরণ হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ১৫টি প্রাক্‌-অর্থায়ন ও পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে ১১ হাজার ৯৫৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও ২ হাজার ৫৬০ কোটি টাকার অর্থায়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বিতরণ করা ও প্রক্রিয়াধীন অর্থ মিলিয়ে মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৫১৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, যা প্যাকেজের মোট বরাদ্দের ২৪ শতাংশেরও কম।

বন্ধ শিল্পকারখানা ও সেবা খাত পুনরায় চালুর লক্ষ্যে গঠিত সহায়ক প্রাক্‌-অর্থায়ন স্কিমে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। তবে গত ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত এ তহবিল থেকে বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ৫৬১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ খাতের বরাদ্দের মাত্র ২ দশমিক ৮ শতাংশ পেয়েছেন উদ্যোক্তারা।

এ স্কিমের আওতায় আরও ৯২৯ কোটি ৫০ লাখ টাকার অর্থায়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বিতরণ ও প্রক্রিয়াধীন অর্থ মিলিয়ে মোট পরিমাণ ১ হাজার ৪৯০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এরপরও বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর জন্য নির্ধারিত বরাদ্দের তুলনায় অর্থায়নের অগ্রগতি খুবই কম।

স্কিমটির আওতায় শিল্প উদ্যোক্তাদের সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে উদ্যোক্তাদের বহন করতে হবে ১ শতাংশ সুদ। বাকি ৬ শতাংশ সরকার ভর্তুকি হিসেবে দেবে। এ প্রণোদনা প্যাকেজের মাধ্যমে ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।

প্রণোদনা প্যাকেজটির মূল উদ্দেশ্য ছিল অর্থনীতিতে তারল্য বাড়ানো, শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সচল রাখা, নতুন বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়া এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। কিন্তু পাঁচ মাসেও অর্থ ছাড়ের গতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে না পৌঁছানোয় এসব লক্ষ্য বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে ক্রমপুঞ্জীভূত বিতরণের পরিমাণ ৬ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা। কটেজ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টির বিশেষ স্কিমে বিতরণ করা হয়েছে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতে চলতি মূলধন পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে বিতরণ করা হয়েছে প্রায় ৯০৮ কোটি টাকা।

সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য গঠিত স্কিমে বিতরণ করা হয়েছে ৫০০ কোটি টাকা। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে নেওয়া পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে বিতরণ হয়েছে ২৯৩ কোটি টাকা।

বৈদেশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে গঠিত অর্থায়ন স্কিমে বিতরণ করা হয়েছে ২০০ কোটি টাকা। উত্তরবঙ্গে কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তোলার পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে বিতরণের পরিমাণ ৪৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। অন্যদিকে, স্টার্টআপ খাতে বিতরণ করা হয়েছে ৩২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এ খাতে আরও ৫ কোটি টাকার অর্থায়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

এদিকে, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির অর্থায়ন স্কিমে ১ হাজার কোটি টাকা, গ্রিন ফ্যাক্টরি বিল্ডিং ও গ্রিন ইন্ডাস্ট্রিজ খাতে পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে ৫২৭ কোটি টাকা এবং চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা রপ্তানিমুখী খাতে ৯৮ কোটি টাকা বিতরণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

প্রণোদনা প্যাকেজের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করা, উৎপাদন বাড়ানো, ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফেরানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। কিন্তু ঘোষণার প্রায় পাঁচ মাস পরও অর্থ ছাড়ের ধীরগতিতে এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এর মধ্যে জ্বালানি সংকটসহ নানা সমস্যায় শিল্প কারখানাগুলো চাপে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রণোদনার অর্থ দ্রুত উদ্যোক্তাদের হাতে পৌঁছানো না গেলে বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করা, উৎপাদন বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, ৬২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার প্রায় পাঁচ মাস পরও বিতরণ হয়েছে মোট বরাদ্দের এক-পঞ্চমাংশের কম অর্থ। বিশেষ করে বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর জন্য বরাদ্দ করা ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে বিতরণ হয়েছে মাত্র ৫৬১ কোটি টাকা। এ পরিস্থিতিতে প্রণোদনার অর্থ দ্রুত ছাড় করা এবং সংকটে থাকা শিল্প খাতে কার্যকরভাবে তা পৌঁছে দেওয়াকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.