সরকার সর্বশক্তি দিয়ে দেশে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করবে: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, তাঁর সরকার সর্বশক্তি দিয়ে সবার জন্য আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করবে এবং দেশে পূর্ববর্তী ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার ধ্বংসকৃত আইনের শাসন পর্যায়ক্রমে প্রতিষ্ঠা করবে। এ দেশের জনগণ যখন বিএনপি সরকারের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করেছে, তখন সরকার তার সর্বশক্তি দিয়ে ইনশাআল্লাহ সবার জন্য আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করবে।

আজ ফেনীর পরশুরাম উপজেলার খেয়াঘাট-মুহুরী সেতু এলাকায় মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ও পানি নিষ্কাশন প্রকল্প পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়) উদ্বোধন শেষে আয়োজিত জনসভায় বক্তৃতাকালে প্রধানমন্ত্রী একথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গত ১৭ বছরে আমরা দেখেছি কীভাবে আইনের শাসনকে ধ্বংস করা হয়েছে। আমরা সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন করতে চাই এবং ধীরে ধীরে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাই।’

সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, কিছু গোষ্ঠী বিভিন্ন ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা’কে কেন্দ্র করে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এ ধরনের প্রচেষ্টা সরকারের উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, যার ফলে শেষ পর্যন্ত জনগণই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তিনি জনগণের জন্য নেওয়া ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল ও নদী খনন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সম্প্রসারণ এবং বন্ধ মিল-কারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এসব কাজে যদি বাধা সৃষ্টি করা হয়, তাহলে ক্ষতি কার হবে? এ দেশের জনগণেরই ক্ষতি হবে।’

নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগে একটি রাজনৈতিক দলের কয়েকজন সদস্যের সংশ্লিষ্টতার প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী অন্যের সমালোচনা করার আগে তাদের নিজেদের দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও অসদাচরণের অভিযোগ খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান।

সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচির প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যাসংখ্যা ৫০ থেকে ১৫০-তে উন্নীত করা হবে। এর ফলে বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন না হলে মানুষকে চিকিৎসার জন্য উপজেলা থেকে জেলা শহর কিংবা ঢাকায় ছুটতে হবে না এবং নিজ এলাকার কাছাকাছি প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাওয়া সম্ভব হবে। সম্প্রসারিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় ডায়ালাইসিস সেবা এবং মা ও শিশুর চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকবে। অতিরিক্ত ১০০টি শয্যা যুক্ত করার পাশাপাশি নতুন বিভাগও চালু করা হবে।

পরশুরামের ৫০ শয্যার হাসপাতালের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে হাসপাতালটির প্রথম ৩০টি শয্যা স্থাপন করা হয় এবং পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে হাসপাতালটির শয্যাসংখ্যা ৫০-এ উন্নীত করা হয়। হাসপাতালটি ১০০ শয্যায় উন্নীত করার দাবি তার কাছে উপস্থাপন করা হয়েছিল। তবে তিনি এর পরিবর্তে হাসপাতালটির শয্যাসংখ্যা ১৫০-তে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বিএনপির নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচির অংশ হিসেবেই এ স্বাস্থ্যসেবা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কর্মজীবী পরিবারের নারীদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করতে সরকার ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিও এগিয়ে নিচ্ছে। ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও মধ্যম আয়ের কৃষকদের সরাসরি সরকারি সহায়তার আওতায় আনতে কৃষক কার্ড দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে কৃষকদের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা দূর করা হবে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার ইতোমধ্যে সুদসহ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করেছে। সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম সাত দিনের মধ্যেই এ ঋণ মওকুফ করা হয়। এতে সরকারের প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে এবং দেশের প্রায় ১৩ লাখ কৃষক এ সুবিধা পেয়েছেন।

মুহুরি-কহুয়া প্রকল্প প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার তার বৃহত্তর খাল ও নদী পুনঃখনন কর্মসূচির অংশ হিসেবে মুহুরি ও কহুয়া নদীর সংযোগকারী খালটি পুনঃখননের কাজ শুরু করেছে। এ সময় তিনি ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার কথা স্মরণ করে বলেন, সে সময় ফেনীতে সেতুর উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছিল এবং নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের বাড়িঘরও পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিকাজে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য পানির ব্যবস্থা করার গুরুত্বকে বিবেচনায় নিয়ে সরকার নির্বাচনের আগেই খাল ও নদী পুনঃখনন কর্মসূচির ঘোষণা করেছিল। এই প্রকল্পের মাধ্যমে এলাকার প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৩৪ হাজার হেক্টর কৃষি জমিতে সেচ সুবিধা পৌঁছাবে। এর ফলে, ফসল উৎপাদন আনুমানিক ১ লাখ মেট্রিক টন বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ‘ফসল উৎপাদন বাড়লে কৃষকরা উপকৃত হবেন। এতে খাদ্যশস্যের দামও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা সম্ভব হবে। প্রধানমন্ত্রী এই খাল ও নদী পুনঃখনন কর্মসূচিকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে শুরু হওয়া একটি উদ্যোগের ধারাবাহিকতা হিসেবে উল্লেখ করেন।

তারেক রহমান বলেন, গত ১৭ বছরে বন্ধ হয়ে যাওয়া মিল ও কারখানাগুলো পুনরায় চালু করার জন্য সরকার কাজ করছে। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করতে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে সরকার দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা করছে এবং তাদেরকে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছে। এই মিল ও কারখানাগুলো পুনরায় চালু হলে আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কর্মসংস্থান বাড়লে ধীরে ধীরে পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে, মানুষ আরও স্বনির্ভর হবে এবং তা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখবে। তাঁর সরকারের কর্মসূচির মধ্যে বেকার মানুষ, নারী, কৃষক, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণ বিএনপিকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে এবং সেই ম্যান্ডেটের ভিত্তিতেই সরকার তার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

প্রধানমন্ত্রী দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া রক্ষায় জনগণকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান। তিনি জানান, বিএনপি শুরুতে যেসব কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল, সেগুলো এখন জনগণের কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে এবং তিনি এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেন। এগুলো এখন আর শুধু বিএনপির কর্মসূচি নয়। এগুলো এখন জনগণের কর্মসূচি। ‘যে কোনো মূল্যে’ দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা হবে।

প্রধানমন্ত্রী যাতে জনগণের জন্য নেওয়া কর্মসূচিগুলো সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেন, সে জন্য তিনি জনগণের দোয়া কামনা করেন।

এর আগে, মুহুরি-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প পুনর্বাসন (পর্যায়-১)-এর উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী খেয়াঘাট ঘাট-মুহুরি সেতু এলাকায় একটি গাছের চারা রোপণ করেন। পরে তিনি মাটি কেটে প্রকল্পের আওতায় একটি খাল পুনঃখননের কাজ উদ্বোধন করেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ড্রেজারের মাধ্যমে নদীর তলদেশ থেকে বালু অপসারণ করে নদী খনন এবং বাঁধ নির্মাণকাজও উদ্বোধন করেন।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.