বহুজাতিক ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের বাংলাদেশের ভোক্তা বা খুচরা ব্যাংকিং (রিটেইল) ব্যবসা ও ক্রেডিট কার্ড ব্যবসা অধিগ্রহণের প্রতিযোগিতায় নেমেছে বেসরকারি সিটি ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি। বৈশ্বিক ব্যবসা পুনর্গঠন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশে আলোচিত ব্যবসা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে চাচ্ছে ১৭৩ বছরের পুরোনো স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের বাংলাদেশের ভোক্তা বা খুচরা ব্যাংকিং (রিটেইল) ব্যবসা ও ক্রেডিট কার্ড ব্যবসা কেনার আগ্রহ জানিয়ে ইতিমধ্যে ব্যাংকটির সঙ্গে পৃথক সভা করেছে ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের প্রধান কার্যালয় ও আঞ্চলিক কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে দেখা করেও বিষয়টি অবহিত করে গেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও তিন ব্যাংকের একাধিক সূত্রে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে প্রক্রিয়া চূড়ান্ত না হওয়ায় আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দিতে রাজি নয় কোনো ব্যাংক।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে এটি হবে কোনো ব্যাংকের আংশিক ব্যবসা বিক্রির প্রথম ঘটনা। এর আগে বিদেশী ব্যাংকের বাংলাদেশে অবস্থিত ব্যবসা বিক্রির ঘটনা ঘটেছে। তবে সেগুলোর ক্ষেত্রে আংশিক নয়, পুরো ব্যবসা বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। ব্যাংকগুলোর মধ্যে কানাডাভিত্তিক নোভা স্কোসিয়া ও পাকিস্তানের আরেক ব্যাংক মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংকের বাংলাদেশে বিদ্যমান ব্যবসা অধিগ্রহণ করেছিল ব্যাংক এশিয়া পিএলসি। এছাড়া পাকিস্তানভিত্তিক আল ফালাহ ব্যাংকের ব্যবসাও ব্যাংক এশিয়া অধিগ্রহণ করছে। তবে এগুলোর কোনোটিই ব্র্যান্ড মূল্যের দিক থেকে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের কাছাকাছি ছিল না।
বাংলাদেশ থেকে আংশিক বা পুরো ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার উদাহরণ অবশ্য আরও আছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে বহুজাতিক ব্যাংক দ্য হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন (এইচএসবিসি)। এর আগে ২০০৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেয় আমেরিকান এক্সপ্রেস ব্যাংক।
সূত্র জানায়, চলতি বছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশের রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। আর এ ব্যবসা অধিগ্রহণে বেশ কয়েকটি ব্যাংক আগ্রহী হয়ে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের সঙ্গে আলোচনা করে। এদের মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক প্রতিযোগিতায় অনেকটাই এগিয়ে আছে।
ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক-উভয়ই মনে করছে, ম্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের আলোচিত ব্যবসা অধিগ্রহণ তথা কিনতে পারলে তাদের আমানত ও ঋণের পোর্টফোলিওতে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হবে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে রয়েছে বাংলাদেশে সবচেয়ে কম সুদের আমানত। তাই এ আমানত অধিগ্রহণ করতে পারলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের তহবিল ব্যয় বেশ কিছুটা কমে আসবে। ব্যাংকের নানা সূচকে উন্নতি হবে। এর বাইরে ব্র্যান্ডিংয়েও নতুন মাইলেজ পাওয়া যাবে।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং খাতে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের আমানত রয়েছে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে ঋণ রয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকটির প্রচলিত ধারার ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি সাদিক ইসলামিক ব্যাংকিং সেবাও রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড সেবা।
স্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকে রিটেইল ব্যাংকিংয়ের যতরকম পণ্য রয়েছে, তার সবই আছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডেও। ব্যাংকটির রিটেইল ব্যাংকিং সেবার মধ্যে রয়েছে স্মার্ট ও চলতি হিসাব, স্থায়ী ও বৈদেশিক মুদ্রা আমানত, প্রিমিয়াম ও রিওয়ার্ড–ভিত্তিক ক্রেডিট কার্ড, জামানতবিহীন ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ। ব্যক্তিগত প্রয়োজনে পার্সোনাল লোন, গাড়ি কিনতে অটো লোন এবং ফ্ল্যাট কেনা বা বাড়ি সংস্কারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হোম লোনের সুবিধা।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে শরিয়া ব্যাংকিং শাখা ও উইন্ডোও আছে। ‘স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড সাদিক’ সেবার আওতায় সুদবিহীন ডিপিএস, কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ও ইসলামিক ক্রেডিট কার্ডের সুবিধা দিয়ে থাকে ব্যাংকটি।
জানা গেছে, সিটি ব্যাংকের ব্যক্তি হিসাবে আমানত রয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে ব্যক্তিগত, গাড়ি, বাড়িসহ ভোক্তা ঋণ রয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যবসা কিনতে পারলে ব্যাংকটির ঋণ স্থিতি একবারে দ্বিগুণ হয়ে যাবে।
অন্যদিকে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যক্তি হিসাবে আমানত রয়েছে ৫৩ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে ভোক্তা ঋণ প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ব্যবসা অধিগ্রহণ করতে পারলে ব্র্যাক ব্যাংকের ভোক্তা ঋণের পোর্টফোলিও বেড়ে যাবে প্রায় ৭২ শতাংশ।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.