শুধু ব্যাংক একীভূত করলেই দেশের ব্যাংকিং খাতের চলমান সংকটের সমাধান হবে না বলে মন্তব্য করেছেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরামের (সিএমজেএফ) আয়োজিত ব্যাংকিং খাতের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে এক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। সংগঠনের সভাপতি মনির হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবীব রাসেল।
পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মাহবুবুর রহমান বলেন, সাধারণত একটি শক্তিশালী ব্যাংকের সঙ্গে তুলনামূলক দুর্বল বা বিশেষায়িত ব্যাংক একীভূত করে সমন্বয় তৈরি করা হয়। এতে একটি ব্যাংকের সক্ষমতা অন্য ব্যাংকের ঘাটতি পূরণে কাজে লাগতে পারে। কিন্তু দুর্বল ব্যাংকের সঙ্গে দুর্বল ব্যাংক একীভূত করা হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল আসবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি বলেন, ব্যাংক একীভূতকরণের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানো এবং পরিচালনাগত অদক্ষতা কমানো। একটি ব্যাংক অন্যটির সঙ্গে একীভূত হলে একই ধরনের কাজের জন্য আলাদা শাখা, জনবল ও পরিচালন কাঠামো রাখার প্রয়োজন কমে যায়। ফলে কাঠামোগত সমন্বয়ের মাধ্যমে ব্যয় কমিয়ে দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।
তবে বাস্তবে একীভূত হওয়ার পর এই সমন্বয় কতটা কার্যকরভাবে করা হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, একীভূত হওয়ার পরও যদি আগের মতোই শাখা ও জনবল কাঠামো বহাল থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, শুধু নাম বা মালিকানা পরিবর্তনের মাধ্যমে ব্যাংক একীভূতকরণের উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। এর ফলে প্রকৃতপক্ষে কী ধরনের সমন্বয় হচ্ছে, পরিচালন ব্যয় কতটা কমছে এবং ব্যাংকের সক্ষমতা কতটা বাড়ছে—এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
তিনি আরও বলেন, দুইটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত হলে নতুন প্রতিষ্ঠানের সামনে পুরোনো সমস্যাগুলোই থেকে যেতে পারে। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, সুশাসনের দুর্বলতা এবং ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই ‘ব্যাড ব্যাংক’ ও ‘ব্যাড ব্যাংক’ একীভূত করে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাবে কি না, সেটি বড় প্রশ্ন।
এদিকে দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে নাজুক অবস্থায় রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, অনেক ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে গেছে। একই সঙ্গে মূলধন পর্যাপ্ততা, তারল্য ও খেলাপি ঋণ—প্রায় সব ক্ষেত্রেই চাপ রয়েছে।
তার ভাষ্য, বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার ৩২ শতাংশের ওপরে। প্রকৃত পরিস্থিতি এর চেয়েও বেশি হতে পারে। ২০০৮ সালে যেখানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা, সেখানে বর্তমানে তা ৬ লাখ কোটি টাকারও বেশি।
তিনি বলেন, খেলাপি ঋণের এই বিশাল বোঝা ব্যাংকের আয় ও মূলধনের ওপর চাপ তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদনের নতুন মানদণ্ড আইএফআরএস-৯ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে ব্যাংকগুলোকে আরও বেশি প্রভিশন রাখতে হতে পারে। এতে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকের মূল ব্যবসা হলো ঋণ দিয়ে সুদ আয় করা। কিন্তু বর্তমানে অনেক ব্যাংকের ঋণ ও অগ্রিম কমছে, বিপরীতে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়ছে। সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে পাওয়া আয় ব্যাংকের মুনাফায় সহায়তা করলেও এটিকে মূল ব্যাংকিং ব্যবসার বিকল্প হিসেবে দেখা যায় না।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে ব্যাংকের লাভজনকতা ধরে রাখতে কম খরচে আমানত সংগ্রহ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে কাসা বা কম খরচের আমানতের পরিমাণ বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
অন্যদিকে ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় কমানোর বিষয়ে মাহবুবুর রহমান বলেন, সব ধরনের ব্যয় কমানোর সুযোগ নেই। বাড়িভাড়া, বেতন-ভাতা, বিমা ও অন্যান্য অনেক পরিচালন ব্যয় নির্ধারিত বা প্রয়োজনীয়। তাই নির্বিচারে কর্মী ছাঁটাই করে ব্যয় কমানোর বদলে প্রযুক্তি ও দক্ষতার ব্যবহার বাড়াতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অন্যান্য প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে ভবিষ্যতে ব্যাংকগুলোতে নতুন জনবল নিয়োগের প্রয়োজন কিছুটা কমতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তার মতে, ব্যাংকের সংখ্যা বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির চিন্তার বদলে ব্যাংকিং খাতকে আরও দক্ষ, উৎপাদনশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর করা প্রয়োজন।
ব্যাংকিং ব্যবসায় ঝুঁকি নেওয়া স্বাভাবিক উল্লেখ করে মাহবুবুর রহমান বলেন, ঝুঁকি পুরোপুরি বাদ দেওয়া নয়, বরং সঠিকভাবে মূল্যায়ন ও ব্যবস্থাপনা করাই গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ব্যাংক পরিচালনায় কার্যকর সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকট কাটাতে শুধু একীভূতকরণ যথেষ্ট নয়। খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, প্রভিশন, সুশাসন এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত সংস্কার করতে হবে।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.