মার্কিন বাজারে বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের হতাশা

সিএনবিসির প্রতিবেদন

যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা দ্রুত বাড়ছে। সাম্প্রতিক জরিপে ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ আগামী ছয় মাসে শেয়ারের দর কমার আশঙ্কা করছেন। একই সময়ে বাজারের কিছু আশাবাদী অংশ মনে করছে, অতিরিক্ত হতাশার এই পরিস্থিতিই উল্টোভাবে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে। সিএনবিসির এক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।

আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিভিজুয়াল ইনভেস্টরসের সর্বশেষ সাপ্তাহিক জরিপে দেখা গেছে, ৫৩ দশমিক ৩ শতাংশ ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারী আগামী ছয় মাসে শেয়ারবাজারের দরপতনের প্রত্যাশা করছেন। এক সপ্তাহ আগেও এই হার ছিল ৩৯ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র এক সপ্তাহে বাজার নিয়ে হতাশা বেড়েছে ১৪ শতাংশ বিনিয়োগকারীর।

অন্যদিকে, শেয়ারের দর বাড়বে বলে আশা করছেন মাত্র ২৮ দশমিক ৮ শতাংশ বিনিয়োগকারী। আগের সপ্তাহে এ হার ছিল ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ আশাবাদী বিনিয়োগকারীর হারও এক সপ্তাহে  ৯ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকা বিনিয়োগকারীর হার নেমে এসেছে ১৭ দশমিক ৯ শতাংশে।

বাজারের ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রত্যাশার ব্যবধান বা ‘বুল-বিয়ার স্প্রেড’ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ঋণাত্মক ২৪ দশমিক ৫ শতাংশীয়পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এ সূচকের দীর্ঘমেয়াদি গড় ৬ দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট। ফলে বর্তমান ব্যবধান স্বাভাবিক মাত্রার তুলনায় অনেক নিচে রয়েছে।

বিনিয়োগকারীদের এই সতর্কতার পেছনে কয়েকটি বিষয় কাজ করছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো জ্বালানি তেলের উচ্চ দাম, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে থাকায় মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাম্প্রতিক সময়ে সুদের হার ২৫ ভিত্তি পয়েন্ট বাড়িয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও কড়াকড়ির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতির প্রভাব বিনিয়োগকারীদের নগদ অর্থ ধরে রাখার প্রবণতাতেও দেখা যাচ্ছে। এএআইআইর বিশেষ জরিপে ১৯ দশমিক ১ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, তাদের নগদ অর্থের মজুত স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। আরও ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ বলেছেন, নগদের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি। সব মিলিয়ে অর্ধেকেরও বেশি বিনিয়োগকারী তুলনামূলক বেশি নগদ ধরে রেখেছেন।

তবে বাজারের এমন নেতিবাচক মনোভাবকেই বিপরীতমুখী একটি সংকেত হিসেবে দেখছেন কিছু বিনিয়োগকারী। তাদের যুক্তি, যখন বাজারের বড় অংশ অতিরিক্ত হতাশ হয়ে পড়ে, তখন বিক্রির চাপের বড় অংশ ইতোমধ্যে তৈরি হয়ে থাকতে পারে। ফলে পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এটি কোনো নিশ্চিত বাজার-পূর্বাভাস নয়; বরং বিনিয়োগকারীদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার একটি ব্যাখ্যা।

বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ পিটার বুকভারও বাজারের অতিরিক্ত একমুখী মনোভাবকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন। তার মতে, বিনিয়োগকারীদের অবস্থান যখন কোনো একটি দিকে খুব বেশি ঝুঁকে যায়, তখন সেটি নজরে রাখার মতো বিষয় হয়ে ওঠে। তবে তিনি এ ধরনের মনোভাবভিত্তিক সূচককে এককভাবে বাজারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের হাতিয়ার হিসেবে দেখার বিষয়ে সতর্ক।

অন্যদিকে, সাম্প্রতিক বাজারের চিত্রও পুরোপুরি একমুখী নয়। ১৮ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া সপ্তাহে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও নাসডাক সূচকে কিছুটা অগ্রগতি ছিল। বিপরীতে ডাও জোন্স সূচক মার্চের পর সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক পতনের মুখে পড়ে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ৫ শতাংশের ওপরে উঠেছে এবং তেলের দাম ১০০ ডলারের বেশি ছিল।

বাজারের বাইরে অর্থপ্রবাহের চিত্রেও বিনিয়োগকারীদের সতর্কতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা চতুর্থ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারভিত্তিক তহবিল থেকে অর্থ বের হয়েছে; ওই সপ্তাহে নিট বহির্প্রবাহ ছিল ৩১ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার। বৈশ্বিক শেয়ার তহবিল থেকেও ২৩ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার বেরিয়ে গেছে, যা নয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ সাপ্তাহিক বহির্প্রবাহ।

তবে এর পাশাপাশি ব্যাংক অব আমেরিকার গবেষণা বলছে, বাজারের অন্য একটি অংশ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারে অর্থ ঢালছে। তাদের হিসাবে, তিন মাসের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত গতিতে মার্কিন শেয়ারে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে বিনিয়োগকারীরা। অর্থাৎ সামগ্রিক বাজারে একই সময়ে ভিন্নমুখী অবস্থানও দেখা যাচ্ছে—একদিকে খুচরা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে, অন্যদিকে কিছু বিনিয়োগকারী বর্তমান দুর্বলতাকে সুযোগ হিসেবে দেখছেন।

এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের সামনে মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে মূল্যস্ফীতি, সুদের হার ও জ্বালানি দামের চাপ কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং এসবের প্রভাব কোম্পানিগুলোর আয় ও অর্থনীতিতে কতটা পড়ে। ফলে বাজারের সাম্প্রতিক নেতিবাচক মনোভাবকে শুধু আতঙ্কের প্রতিফলন হিসেবে দেখা যাবে, নাকি এটি বড় ধরনের পরিবর্তনের পূর্বসংকেত—তা নির্ভর করবে পরবর্তী অর্থনৈতিক তথ্য ও বাজারের গতিপথের ওপর।

 

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.