আইন-বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী আনিসুল হক ও তার তিন সহযোগীর বিরুদ্ধে প্রায় ১৮১ কোটি টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ ও ৭৩৭ কোটি টাকার সন্দেহভাজন লেনদেনের প্রমাণ পাওয়ায় চার্জশিট অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে ওই চার্জশিট অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে সংস্থাটির সচিব সাইদুর রহমান খান জানিয়েছেন।
মামলায় আনিসুল হক একমাত্র আসামি থাকলেও অনুমোদিত চার্জশিটে তার আত্মীয় ও বিএইচআইএস অ্যাপারেলসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইকবাল, ভাগিনা শেখ মো. ইফতেখারুল ইসলাম ও ছোট ভাইয়ের জেবুন্নেসা বেগম হককে আসামি করা হয়েছে।
গত ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। ওই সময় তার বিরুদ্ধে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার সম্পদ ও ৭০০ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়েছিল।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০০ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত সময়কালে আনিসুল হক নিজ নামে ৪ কোটি ৮৭ লাখ ৬৮ হাজার ২২৫ টাকার স্থাবর এবং ৯১ কোটি ৯২ লাখ ৯৮ হাজার ৬৫৫ টাকার অস্থাবরসহ মোট ৯৬ কোটি ৮০ লাখ ৬৬ হাজার ৮৮০ টাকার সম্পদ অর্জন করেন। তবে নিজের অর্জনের পাশাপাশি স্বজনদের নাম ব্যবহার করে তিনি বিপুল অঙ্কের অর্থ বেনামে বিনিয়োগ করেছেন।
দুদকের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ছোট ভাইয়ের স্ত্রী জেবুন্নেসা বেগম হকের নামে ২৩ কোটি ৩২ লাখ ২ হাজার ৩২১ টাকার অস্থাবর সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। যার মধ্যে সিটিজেনস ব্যাংকের ১০ কোটি টাকার শেয়ার ও ১৩ কোটি টাকার এফডিআর রয়েছে। ভাগিনা শেখ মো. ইফতেখারুল ইসলামের নামে ২০ কোটি ৭১ লাখ ৮১ হাজার ৮৪৪ টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। এছাড়া কথিত কাজিন মোহাম্মদ ইকবালের নামে অর্জিত ৪০ কোটি ১ লাখ ২৩ হাজার ২৩৬ টাকার অস্থাবর সম্পদের সিংহভাগ অর্থাৎ ৪০ কোটি টাকার বেশি রয়েছে সিটিজেনস ব্যাংকের শেয়ারে। স্বজনদের বেনামে গড়ে তোলা এই অস্থাবর সম্পদের মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ৮৪ কোটি ৫ লাখ ৭ হাজার টাকা।
দুদকের অনুসন্ধানে আনিসুল হকের বৈধ ও গ্রহণযোগ্য আয়ের পরিমাণ পাওয়া যায় ১৩ কোটি ২৭ লাখ ৯৫ হাজার ২৩৮ টাকা। এর বিপরীতে তার পারিবারিক ব্যয় পাওয়া গেছে ৪ কোটি ৬৬ লাখ ৫৪ হাজার ২৯৮ টাকা। পারিবারিক ব্যয় বাদ দিলে তার নিট সঞ্চয় থাকার কথা ৮ কোটি ৬১ লাখ ৪০,৯৪০ টাকা। অথচ তার মোট সম্পদের পরিমাণ অর্জিত সঞ্চয়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি হওয়ায় ১৭২ কোটি ২৪ লাখ ৩২ হাজার ৯৪১ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ পুরোপুরি অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। সব মিলিয়ে তদন্তে সাবেক এই মন্ত্রীর নামে-বেনামে মোট ১৮০ কোটি ৮৫ লাখ ৭৩ হাজার ৮৮১ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ১৭২ কোটি ২৪ লাখ ৩২ হাজার ৯৪১ টাকার সম্পদই অবৈধ বা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত।
শুধু অবৈধ সম্পদ অর্জনই নয়, ব্যাংক হিসাবে সন্দেহজনক বিশাল অঙ্কের লেনদেনের প্রমাণও মিলেছে তদন্তে। সাবেক মন্ত্রী ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ২৩টি ব্যাংক হিসাবে মোট ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ৯৯ হাজার ৪৫২ টাকা জমা এবং ৩৬১ কোটি ৭৩ লাখ ২৭ হাজার ১২৯ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এসব হিসাবে সর্বমোট ৭৩৭ কোটি ২৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৮১ টাকার অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক লেনদেনের প্রমাণ পেয়েছে দুদক।
তাদের বিরুদ্ধে ২০০৪-এর ২৭(১) ধারা, দণ্ডবিধির ১০৯ ধারা, ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় চার্জশিট মঞ্জুর হয়েছে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা-আখাউড়া) আসনের কসবা উপজেলা শাখা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট গোপন তথ্যের ভিত্তিতে নৌপথে পলায়নরত অবস্থায় রাজধানীর সদরঘাট এলাকা থেকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর থেকে তিনি কারাগারে আটক রয়েছেন।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.