ঋণনির্ভরতা কমিয়ে উৎপাদনমুখী অর্থনীতি গড়তে চায় সরকার: তিতুমীর

ঋণ ও দুর্নীতিনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশকে উৎপাদনমুখী অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে চায় সরকার। একই সঙ্গে রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিদ্যমান স্বজনপ্রীতি, বৈষম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কাটিয়ে বিনিয়োগ ও উৎপাদনের অনুকূল পরিবেশ তৈরির লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতের সংকটের কারণে জনগণের ভোগান্তি দূর করতে সরকার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। একই সঙ্গে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। এ জন্য পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাসহ স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার।

এর আগে বিভিন্ন বক্তব্যেও অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, দেশীয় ও রপ্তানিমুখী শিল্পে সমান সুযোগ এবং প্রশাসনিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিতুমীর।

অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে, উৎপাদনমুখী অর্থনীতিতে রূপান্তরের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো ঋণের অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, তা নিশ্চিত করা। বিদেশি বা অভ্যন্তরীণ ঋণ যদি উৎপাদনশীল খাত, অবকাঠামো, শিল্প ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা ভবিষ্যৎ আয় বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিপরীতে অনুৎপাদনশীল ব্যয় বা দুর্বল প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দিতে পারে।

সাম্প্রতিক বক্তব্যে তিতুমীরও ঋণ নেওয়ার বিপরীতে কী ধরনের অর্থনৈতিক সুফল তৈরি হচ্ছে, সেই প্রশ্নের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর মাধ্যমে ঋণের অর্থকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে।

অন্যদিকে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে শুধু অর্থনীতির আকার বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; বিনিয়োগ, রপ্তানি, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও আর্থিক শৃঙ্খলা—সব ক্ষেত্রেই কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। সরকারের পক্ষ থেকেও এই লক্ষ্যকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, সংস্কার ও পুনর্গঠনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট উৎপাদনশীল খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠলে কাঙ্ক্ষিত শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই অর্থনীতিকে উৎপাদনমুখী করতে হলে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি বিনিয়োগের পরিবেশ, নীতির স্থিতিশীলতা, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্রব্যবস্থা স্বজনপ্রীতি ও বৈষম্যে ছেয়ে গেছে উল্লেখ করে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে কাজ করছে সরকার। অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে হলে সুযোগের সমতা এবং সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

সব মিলিয়ে সরকারের ঘোষিত অর্থনৈতিক রূপান্তরের মূল চ্যালেঞ্জ হবে ঋণ ও সরকারি ব্যয়কে কতটা উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। ২০৩৪ সালের ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে এই রূপান্তর সফল হবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করবে অর্থনৈতিক সংস্কার কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং উৎপাদনশীল খাতে নতুন বিনিয়োগ কতটা বাড়ে তার ওপর।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.