ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলীয় আল-জাওফ প্রদেশের একটি কারাগারে সৌদি আরব বিমান হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে হুথি বিদ্রোহীরা। তাদের দাবি, সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) আল-হাজম শহরের ওই হামলায় এক শিশুসহ অন্তত সাতজন নিহত ও আরও সাতজন আহত হয়েছেন। একই সময়ে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে বাব আল-মানদাব প্রণালির দিকে হুথিদের অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা এবং সরকারি বাহিনীর পাল্টা হামলায় ইয়েমেনে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হুথি নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আনিস আল-আসবাহি জানান, ‘সেন্ট্রাল কারেকটিভ ফ্যাসিলিটি’ কারাগারে সৌদি হামলা চালানো হয়। কারাগারের ধ্বংসস্তূপের নিচে ৩৫ জন বন্দি ও এক নারী আটকা পড়েছেন বলেও হুথি-নিয়ন্ত্রিত আল-মাসিরাহ টেলিভিশনের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। হামলার পর প্রকাশিত ভিডিওতে ভবনের একটি অংশ ধসে পড়া এবং উদ্ধারকারীদের ধ্বংসস্তূপ সরাতে দেখা যায়। তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং সৌদি আরব এখনো অভিযোগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
বাব আল-মানদাবের দিকে হুথিদের অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা
কারাগারে হামলার অভিযোগটি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার ও হুথিদের মধ্যে লড়াই তীব্র হয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হুথিরা পশ্চিমাঞ্চলের তাইজ ও দক্ষিণ হোদেইদাহ হয়ে আল-মাখা বা মোখার দিকে অগ্রসর হয়ে কৌশলগত বাব আল-মানদাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণের দিকে এগোতে চাইছে বলে সরকারি বাহিনী ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এর জবাবে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী গত কয়েক দিনে আল-বারাহ, হোদেইদাহর দক্ষিণাঞ্চল, মারিবের পশ্চিমাঞ্চল এবং আল-জাওফসহ বিভিন্ন এলাকায় হুথি অবস্থানে বিমান হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে। হুথিরাও সৌদি আরবের কয়েকটি নজরদারি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে। এসব দাবির বিষয়ে রিয়াদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সৌদি জাহাজে হামলার পর নতুন ঝুঁকি
বাব আল-মানদাব ঘিরে সংঘাত শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক নৌপথেও। গত জুলাইয়ে হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করে। এরপর সৌদি মালিকানাধীন জাহাজ ও তেল পরিবহন ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটেছে। আগস্টে একটি সৌদি তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনায় জাহাজটির মালিকানা নিশ্চিত করা হলেও সব নাবিক নিরাপদে ছিলেন বলে জানানো হয়।
এর আগে ১২ আগস্ট বাব আল-মানদাব প্রণালিতে ‘তিহামাহ’ নামের একটি পণ্যবাহী জাহাজে হুথি হামলায় অন্তত ছয়জন নিহত ও ১০ জন আহত হওয়ার অভিযোগ করে ইয়েমেনের সরকার। ঘটনাটি চলমান সংঘাতের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজে প্রাণহানির সবচেয়ে গুরুতর ঘটনাগুলোর একটি হয়ে ওঠে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদাব
বাব আল-মানদাব লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবেশপথ। এ পথ দিয়ে ইউরোপ-এশিয়ার মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়। ফলে এখানে সামরিক সংঘাত বাড়লে জাহাজগুলোকে দীর্ঘ বিকল্প পথে চলতে হতে পারে, বাড়তে পারে পরিবহন ব্যয় ও বীমা খরচ।
বর্তমানে পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বেড়েছে হরমুজ প্রণালির সংকটের কারণে। হরমুজে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার বিপরীতে ৮ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী বাব আল-মানদাব দিয়ে একদিনে ২৯টি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করেছে, আগের দিন যা ছিল ১৭টি। তবে জাহাজের কিছু ট্রান্সপন্ডার বন্ধ থাকায় প্রকৃত সংখ্যা ভিন্ন হতে পারে।
অর্থাৎ হরমুজে চাপ বাড়ার পর বাব আল-মানদাবও যদি বড় ধরনের সংঘাতের কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডোর একই সময়ে ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন শঙ্কা
নৌপথে হামলার ঝুঁকি বাড়ায় ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সতর্কতা জারি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মেরিটাইম অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সাম্প্রতিক সতর্কতায় দক্ষিণ লোহিত সাগর, বাব আল-মানদাব ও এডেন উপসাগরে হুথিদের ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, ছোট নৌযান ও অন্যান্য হামলার ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজকে উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ফলে ইয়েমেনে কারাগারে হামলার মতো স্থলভাগের সংঘাত এখন আর কেবল স্থানীয় নিরাপত্তা সংকট নয়। বাব আল-মানদাবের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই তীব্র হলে এর প্রভাব লোহিত সাগর, জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য এবং বিশ্ববাজার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো—ইয়েমেনের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির অবস্থা আরও নাজুক হয়ে পড়ছে। হুথিদের বাব আল-মানদাবমুখী অগ্রসরতা ঠেকাতে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর অভিযান এবং পাল্টা হুথি হামলা অব্যাহত থাকলে দেশটির যুদ্ধ আবার পূর্ণমাত্রায় ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথও দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার মুখে পড়তে পারে।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.