মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ছয় সপ্তাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি উঠেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় বড় ধরনের সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৬ ডলার ছাড়িয়েছে। দিনের শুরুতে দাম ৯৭ দশমিক ৯৩ ডলারে উঠে ২৪ জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। পরে কিছুটা কমে ৯৬ দশমিক ১৯ ডলারে লেনদেন হয়, যা আগের দিনের তুলনায় ৯ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ১ শতাংশ কম।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ৪৫ সেন্ট কমে ব্যারেলপ্রতি ৯১ দশমিক ০৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত সপ্তাহে ব্রেন্টের দাম প্রায় ৮ শতাংশ এবং ডব্লিউটিআইয়ের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে।
গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইরানের তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালায়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, হামলার একটি খার্গ দ্বীপের কাছে চালানো হয়। খার্গ দ্বীপ ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র।
এর পাল্টা জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালিতে অনুমোদনহীন রুটে চলাচলকারী তিনটি তেলবাহী জাহাজ এবং অন্যান্য এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের আরও তিনটি জাহাজকে লক্ষ্য করেছে।
জাহাজে হামলার এই পাল্টাপাল্টি ঘটনাকে সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ধরনের উত্তেজনা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। বাণিজ্যিক জাহাজকে পারস্পরিক অর্থনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে সামরিক সংঘাত ও বাণিজ্যিক নৌযানের মধ্যকার আগের সীমারেখা আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ দিনে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ১০টি পণ্যবাহী জাহাজ এ প্রণালি অতিক্রম করেছে, যা মে মাসের পর সর্বনিম্ন।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ট্যাংকার চলাচল আরও কমে গেলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কার আশঙ্কা তৈরি হবে। এরই মধ্যে বাজারে সেই ঝুঁকির কিছুটা প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। গোল্ডম্যান স্যাকসও সতর্ক করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের জাহাজে হামলা আরও বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।
এর মধ্যেই হরমুজ প্রণালির বাইরে একটি ‘রেস্ট্রিকটেড জোন’ ঘোষণা করার কথা জানিয়েছে ইরান। দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এ বিষয়ে ঘোষণা দেওয়া হবে।
অন্যদিকে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেক প্লাস অক্টোবরে তেল উৎপাদন নীতি অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রোববারের বৈঠকে জোটটি উৎপাদন নীতিতে কোনো পরিবর্তন না আনলেও পরবর্তী ধাপে উৎপাদন কোটা নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় তেলের বাজারে সরবরাহ সংকটের ঝুঁকি আরও বাড়ছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জ্বালানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ওপরও নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.