ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ফের সরাসরি সামরিক সংঘাত তীব্র হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে ইরানের বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এতে কয়েকজন নিহত ও ৫০ জনের বেশি আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। হামলার জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে জর্ডান, ইরাক, কুয়েত ও বাহরাইনে থাকা মার্কিন সামরিক অবস্থানগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে তেহরান।
তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলুর প্রতিবেদনে ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্সের বরাতে বলা হয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় সিরিক শহরে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন হামলায় অন্তত দুজন নিহত এবং ২০ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে বলে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যের বরাতে জানানো হয়েছে।
ইরানের কোনারাক কাউন্টি, জাস্ক ও বন্দর লেঙ্গেহ শহরও মার্কিন হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জিরোফতে একটি বেসামরিক বিমানবন্দরেও হামলা চালানো হয়েছে।
হরমুজগান প্রদেশের বন্দর আব্বাসের পূর্বাঞ্চলেও একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। একইভাবে কেশম দ্বীপের মাসান গ্রামের আশপাশে পাঁচটির বেশি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। হরমুজ প্রণালির দিক থেকেও আরও কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়ার কথা জানিয়েছে আইআরআইবি।
ইরানে চালানো বৃহত্তর সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে দেশটির সরকারি মালিকানাধীন দুটি তেলবাহী ট্যাংকারেও যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে বলে মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে ইরানের হামলার জবাবে দেশটির ট্যাংকারে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার ঘটনা এটিই প্রথম। তবে এ হামলায় কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তাদের বাহিনী ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এসব লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার, সামুদ্রিক সম্পদ ও স্থাপনা, মাইন স্থাপনের সক্ষমতা এবং যোগাযোগ অবকাঠামো রয়েছে।
মার্কিন হামলার পর পাল্টা আঘাতে যায় ইরান। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে জর্ডান, ইরাক, কুয়েত ও বাহরাইনে থাকা মার্কিন সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান।
আইআরজিসির দাবি, জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটিতে থাকা মার্কিন ড্রোনের হ্যাঙ্গার লক্ষ্য করে একটি ভারী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। তাদের দাবি, হামলায় কয়েকটি ড্রোন ধ্বংস এবং মার্কিন ফ্লাইট ও কারিগরি বিভাগের কয়েকজন কর্মী নিহত হয়েছেন। ঘাঁটির কয়েকটি কারিগরি স্থাপনাতেও আগুন ধরে যায় বলে দাবি করেছে তেহরান।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। মার্কিন পক্ষ থেকে হামলায় কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেনি বলে জানানো হয়েছে।
জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করে। এর মধ্যে ১০টি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে মাঝপথে ধ্বংস করা হয়েছে।
অবশিষ্ট তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র জনবসতি থেকে দূরের এলাকায় পড়েছে বলে জানিয়েছে জর্ডানের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট। এতে কোনো হতাহত বা প্রাণহানি হয়নি বলে জানিয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনী।
উত্তর ইরাকের এরবিল প্রদেশে মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে আইআরজিসি।
ইরানের দাবি, হামলায় একটি মেরামত কেন্দ্র, কারিগরি সরঞ্জাম রাখার গুদাম এবং মার্কিন নজরদারি বেলুনের একটি গাইডেন্স সিস্টেম ধ্বংস হয়েছে। একই সঙ্গে ঘাঁটির জ্বালানি ট্যাংকে আগুন ধরে যায় এবং কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন বলেও দাবি করেছে তেহরান। তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘শত্রু ড্রোন’ হামলা প্রতিহত করেছে। দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ জানিয়েছে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ড্রোন ভূপাতিত করার সময় যেসব বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে, সেগুলো ওই প্রতিরোধ অভিযানের অংশ।
কুয়েতি কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে ইরানের সামরিক তৎপরতার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করেছে।
বাহরাইনের শেখ ঈসা বিমানঘাঁটিতে মার্কিন সেনা মোতায়েন থাকা এলাকা এবং রাডার স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে একাধিক ড্রোন ছোড়ার কথা জানিয়েছে ইরানের সেনাবাহিনী।
ইরানের বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, দেশটির সেনাবাহিনীর দাবি অনুযায়ী এই হামলা ‘অপারেশন থান্ডার’-এর ২৯তম ধাপের অংশ। তেহরানের ভাষ্য, পারস্য উপসাগরে মার্কিন সামরিক কার্যক্রমের জন্য শেখ ঈসা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। সেখানে হেলিকপ্টার রক্ষণাবেক্ষণ, ড্রোন সরঞ্জাম এবং নজরদারি উড়োজাহাজ-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
তবে বাহরাইনের ওই ঘাঁটিতে হামলায় কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নির্ভরযোগ্য বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ইরানের অভ্যন্তরে মার্কিন হামলা এবং এর জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক অবস্থানে তেহরানের পাল্টা হামলার ঘটনায় সংঘাত এখন আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও নৌ চলাচল নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকলে সংঘাত শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.