বাংলাদেশের তরুণ শ্রমিকদের খাতভিত্তিক সহায়তা প্রয়োজন, একক নীতি নয়: নতুন গবেষণা

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ ও স্যানেমের গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশের জাস্ট ট্রানজিশন মোকাবিলায় তরুণ শ্রমিকদের প্রয়োজন নগদ সহায়তা, দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও চাকরি খুঁজে পেতে সহায়তা, স্থানান্তর অনুদান নয়।

মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশের একজন তরুণ কোথায় কাজ করেন এবং কোথায় বসবাস করেন, তা তার শোভন কর্মসংস্থানের সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে অন্য যেকোনো বিষয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আজ ঢাকায় আয়োজিত এক প্রচার ও মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রকাশিত অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ ও স্যানেমের দক্ষিণ এশীয় অর্থনৈতিক মডেলিং নেটওয়ার্কের নতুন গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। তৈরি পোশাক, কৃষি ও নির্মাণ খাতের তরুণ শ্রমিকদের পরিবহন খাতের শ্রমিকদের তুলনায় নিরাপদ ও স্থিতিশীল চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের অবস্থান সবচেয়ে শক্তিশালী হলেও, এই খাতের অনেক শ্রমিক এখনো প্রকৃত কর্মসংস্থান অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছেন। ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা বা বন্যার ঝুঁকিতে থাকা জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করাও লিঙ্গ বা খাত নির্বিশেষে একজন তরুণের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা আরও কমিয়ে দেয়।

বিষয়টির গুরুত্ব অনেক বেশি। বাংলাদেশ বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের দশমিক ৫ শতাংশেরও কমে অবদান রাখলেও গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্সে সপ্তম অবস্থানে রয়েছে এবং দেশটির অর্থনীতি এখনো কার্বন-নির্ভর খাতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তৈরি পোশাক শিল্পে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন এবং দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি এই খাত থেকে আসে। অন্যদিকে কৃষি খাতে কর্মশক্তির ৪১ শতাংশ নিয়োজিত, ফলে উভয় খাত এবং এসব খাতে কর্মরত তরুণরা সামনে আসা এই পরিবর্তনের ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, প্রচলিত ধারণার তুলনায় স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কারণে তৈরি পোশাক খাতে চাকরি হারানোর ঘটনা কম। নির্মাণ শ্রমিকদের মজুরি ও কর্মক্ষেত্রে আহত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রায় কোনো সুরক্ষা নেই। অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের সহায়তা লক্ষ্যভিত্তিকভাবে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বর্তমানে কোনো নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যভান্ডারও নেই। তরুণ শ্রমিকরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তারা স্থানান্তর অনুদান বা ব্যবসা শুরুর মূলধনের পরিবর্তে নগদ সহায়তা, দক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং চাকরি খুঁজে পেতে সহায়তা চান। খাতভেদে অগ্রাধিকারও ভিন্ন। নির্মাণ শ্রমিকরা নগদ সহায়তাকে বেশি গুরুত্ব দেন, তৈরি পোশাক ও পরিবহন খাতের শ্রমিকরা চাকরি খুঁজে পেতে সহায়তা চান এবং কৃষি শ্রমিকরা নগদ সহায়তা ও প্রশিক্ষণের সমন্বয় চান। প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার ক্ষেত্রেও পার্থক্য রয়েছে। কৃষকরা সবচেয়ে বেশি সরকারের ওপর নির্ভর করেন, তৈরি পোশাক ও নির্মাণ শ্রমিকরা তাদের নিয়োগকর্তার ওপর এবং পরিবহন শ্রমিকরা তাদের ইউনিয়নের ওপর বেশি আস্থা রাখেন। ফলে একটি জাতীয় বার্তার পরিবর্তে খাতভিত্তিক ও লক্ষ্যভিত্তিক যোগাযোগের প্রয়োজন রয়েছে।

“তরুণরা এই পরিবর্তনের ঝুঁকির মুখে তুলনামূলকভাবে বেশি থাকলেও, বাংলাদেশকে আরও টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তারাই সবচেয়ে উপযুক্ত প্রজন্ম,” বলেন স্যানেমের প্রোগ্রাম পরিচালক জুবায়ের হোসেন। “এই কারণেই আমরা বিশেষভাবে তরুণদের কেন্দ্র করে এই প্রমাণভিত্তিক তথ্যভান্ডার তৈরি করেছি।”

“জাস্ট ট্রানজিশন এখন বৈশ্বিক ও জাতীয়—উভয় পর্যায়েই অগ্রাধিকার পাচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোর ওপর ব্যাপক নির্ভরতার কারণে এই আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ,” বলেন স্যানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সেলিম রায়হান।

“প্রমাণ বলছে, একক ধরনের সমাধান কার্যকর হবে না,” বলেন স্যানেমের গবেষণা অর্থনীতিবিদ ফারহান খান। তিনি জুবায়ের হোসেনের সঙ্গে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন। “তরুণ শ্রমিকদের প্রয়োজন খাতভেদে ভিন্ন এবং এসব উদ্যোগের নকশা তৈরির ক্ষেত্রে তাদের প্রকৃত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের জন্য তৈরি করা কর্মসূচির শুধু সুবিধাভোগী হিসেবে তাদের রাখা যাবে না।”

গবেষণার তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে মাঠপর্যায়ের ও অনলাইন জরিপ, ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যদাতার সাক্ষাৎকার এবং অংশগ্রহণমূলক কর্মশালার মাধ্যমে। উপকূলীয়, নদীবিধৌত ও শহুরে এলাকার বৈচিত্র্যময় জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরতে দেশের নয়টি জেলার ৬২৫ জন তরুণ শ্রমিককে নমুনা হিসেবে নির্বাচন করা হয়।

অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তা, নিয়োগকর্তাদের সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা গবেষণার ফলাফল নিয়ে আলোচনা করেন। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, জাতীয় দক্ষতা প্রশিক্ষণকে ভবিষ্যতে তৈরি হওয়া এবং কমে যাওয়া চাকরির সঙ্গে সামঞ্জস্য করে সাজাতে হবে। অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের সরকারি তথ্যের আওতায় আরও ভালোভাবে আনতে হবে। ভবিষ্যৎ গবেষণার পর্বগুলোতে পলিটেকনিক শিক্ষার্থী এবং পেশাগতভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকেও অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়।

“বাস্তব চাকরির সঙ্গে যুক্ত না হলে শুধু প্রশিক্ষণ যথেষ্ট নয়,” বলেন অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির, যিনি অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। “এমন কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, যা প্রকৃত অর্থেই নিয়োগকর্তাদের কাজে লাগে। অনানুষ্ঠানিক ও নির্মাণ শ্রমিকদের জন্য আরও শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা প্রয়োজন এবং পরিবর্তনের সময় তরুণদের শুধু সহায়তা দেওয়াই নয়, বরং এই পরিবর্তনের রূপ নির্ধারণেও তাদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।”

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.