ইসরায়েলি বন্ড বিক্রি বন্ধে আয়ারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর চাপ চায় অ্যামনেস্টি

আয়ারল্যান্ডের সবচেয়ে বড় সংগীত উৎসব **‘ইলেকট্রিক পিকনিক’**কে শুধু বিনোদনের আয়োজন হিসেবে নয়, গাজা যুদ্ধ নিয়ে জনমত গঠনের প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও ব্যবহার করছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। উৎসবস্থলে সংগঠনটির বুথ থেকে দর্শনার্থীদের আয়ারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর চাপ সৃষ্টি করার আহ্বান জানানো হচ্ছে, যাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে ইসরায়েলি সরকারি বন্ড বিক্রির অনুমোদন না দেওয়া হয়।

অ্যামনেস্টির এই প্রচারণার সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। ইসরায়েলি বন্ডের বর্তমান ইউরোপীয় প্রসপেক্টাসের মেয়াদ ৩১ আগস্ট ২০২৬ শেষ হওয়ার কথা। লুক্সেমবার্গ ইতোমধ্যে জানিয়েছে, তারা বর্তমান প্রসপেক্টাস নবায়ন করবে না। ফলে নতুন করে বন্ডের অনুমোদন বা অন্য কোনো ইইউ সদস্যরাষ্ট্রে এর কার্যক্রম স্থানান্তরের প্রশ্নটি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অ্যামনেস্টি চাইছে, আয়ারল্যান্ডও যেন নতুন প্রসপেক্টাস অনুমোদন না করে এবং বন্ডের অনুমোদন অন্য কোনো ইইউ দেশে স্থানান্তরেও সম্মতি না দেয়।

কেন আয়ারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে টার্গেট করছে অ্যামনেস্টি?

এর পেছনে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক ইতিহাস। ব্রেক্সিটের পর ইসরায়েলি বন্ডের ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের জন্য আয়ারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘হোম মেম্বার স্টেট’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিল। ২০২৫ সালে ব্যাপক রাজনৈতিক ও নাগরিক চাপের পর ইসরায়েলি বন্ডের প্রসপেক্টাসের অনুমোদন লুক্সেমবার্গে স্থানান্তরিত হয়। এরপর থেকে লুক্সেমবার্গের আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিএসএসএফ এই বন্ডের প্রসপেক্টাস তদারক করছে।

অর্থাৎ, অ্যামনেস্টির বর্তমান প্রচারণা মূলত একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আনছে—ইউরোপের কোনো দেশ কি এমন একটি আর্থিক পণ্যের জন্য নিয়ন্ত্রক অনুমোদন দেবে, যার মাধ্যমে ইসরায়েলি সরকার অর্থ সংগ্রহ করতে পারে?

বন্ড নিয়ে বিতর্ক কোথায়?

‘ইসরায়েল বন্ড’ হচ্ছে ইসরায়েল সরকারের অর্থ সংগ্রহের একটি আর্থিক মাধ্যম। অ্যামনেস্টির দাবি, এসব বন্ডের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ ইসরায়েলের সাধারণ রাষ্ট্রীয় বাজেটে যায় এবং ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ নিজেই ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে বন্ড ইস্যু বাড়ানোর কথা জানিয়েছে। সংগঠনটির যুক্তি হলো, অর্থ সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট সামরিক অভিযানেই ব্যয় হচ্ছে—এমনটা না হলেও রাষ্ট্রীয় বাজেটে অর্থ প্রবাহ বাড়ানোর মাধ্যমে এটি সরকারের সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতা ও সামরিক কার্যক্রমকে পরোক্ষভাবে সহায়তা করতে পারে।

এখানেই অ্যামনেস্টি আর্থিক সহায়তা বনাম মানবাধিকার দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি সামনে আনছে। তাদের বক্তব্য, গাজায় সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক অপরাধের প্রেক্ষাপটে কোনো রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান যদি অর্থনৈতিকভাবে সহায়ক ভূমিকা রাখে, তাহলে সেই ভূমিকারও আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে মূল্যায়ন প্রয়োজন। অ্যামনেস্টি বিশেষভাবে আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যা প্রতিরোধ এবং তাতে সহায়তা না করার রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের কথা উল্লেখ করেছে।

তবে এটিকে আন্তর্জাতিক আদালতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। ইসরায়েলি বন্ড অনুমোদন নিজেই আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যায় সহায়তার অপরাধ—এমন কোনো চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত এখানে নেই; এটি অ্যামনেস্টির আইনগত ও মানবাধিকারভিত্তিক অবস্থান।

‘ইলেকট্রিক পিকনিক’ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

অ্যামনেস্টি সাধারণ কোনো রাজনৈতিক সমাবেশের বদলে একটি বড় সাংস্কৃতিক উৎসবকে প্রচারণার জায়গা হিসেবে বেছে নেওয়ায় বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে সংগঠনটি এমন একটি শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাচ্ছে, যারা সরাসরি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ না নিলেও নাগরিক ও মানবাধিকার ইস্যুতে মতামত তৈরি করতে পারে।

এর উদ্দেশ্য শুধু একটি পিটিশনে স্বাক্ষর করানো নয়; বরং ভোক্তা, নাগরিক ও ভোটারদের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে মানবাধিকারকে যুক্ত করা। অর্থাৎ, ‘কোনো যুদ্ধের সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই’—এই ধারণার পরিবর্তে আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগ এবং সরকারি ঋণ ব্যবস্থার মাধ্যমে সাধারণ মানুষেরও পরোক্ষ সম্পর্ক তৈরি হতে পারে—এই বার্তাই দেওয়া হচ্ছে।

একই প্রচারণায় হুসাম আবু সাফিয়ার প্রসঙ্গ কেন?

ইসরায়েলি বন্ডের পাশাপাশি অ্যামনেস্টি গাজার কামাল আদওয়ান হাসপাতালের পরিচালক ড. হুসাম আবু সাফিয়ার মুক্তির দাবিও তুলছে।

অ্যামনেস্টির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর তাকে আটক করা হয় এবং ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত তিনি ১৮ মাসের বেশি সময় ধরে কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই ইসরায়েলি হেফাজতে ছিলেন। সংগঠনটি তার আটককে বেআইনি ও স্বেচ্ছাচারী বলে দাবি করেছে এবং তার স্বাস্থ্য ও আটক অবস্থার বিষয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

ফ্রন্টলাইন ডিফেন্ডার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল ইসরায়েলের একটি আদালত তাকে Unlawful Combatants Law-এর আওতায় অভিযোগ ছাড়াই আটকে রাখার মেয়াদ বাড়ায়।

ফলে অ্যামনেস্টির প্রচারণায় দুটি আলাদা ইস্যু আসলে একটি বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে যুক্ত হয়েছে—গাজা যুদ্ধের মানবিক পরিণতি এবং সেই যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে সংগঠনটি যে আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে দেখছে।

বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন: অর্থনৈতিক সম্পর্ক কতটা বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব?

এই প্রচারণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে শুধু কূটনৈতিক বা সামরিক নিষেধাজ্ঞার দাবি করছে না; বরং আর্থিক বাজারের নিয়ন্ত্রক কাঠামোকেও জবাবদিহির আওতায় আনার চেষ্টা করছে।

অ্যামনেস্টির যুক্তি সফল হলে ভবিষ্যতে ইউরোপীয় বাজারে কোন দেশের সরকারি বন্ড বিক্রি সংক্রান্ত নানা প্রশ্ন উঠতে পারে।

এসব প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। কারণ বন্ড অনুমোদন করা এবং কোনো সরকারের সামরিক নীতিকে রাজনৈতিকভাবে সমর্থন করা একই বিষয় নয়। আর্থিক নিয়ন্ত্রকের মূল দায়িত্ব সাধারণত বাজারের স্বচ্ছতা, বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা ও আইনগত নিয়ম নিশ্চিত করা। কিন্তু যখন কোনো আর্থিক পণ্যের সঙ্গে গুরুতর মানবাধিকার অভিযোগ জড়িয়ে পড়ে, তখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর রাজনৈতিক ও নৈতিক চাপও তৈরি হতে পারে।

সার্বিকভাবে আয়ারল্যান্ডে অ্যামনেস্টির এই উদ্যোগকে তাই শুধু একটি মানবাধিকার প্রচারণা হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি ধরা পড়বে না। এটি গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইউরোপের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা, রাষ্ট্রীয় বন্ড বাজার এবং আন্তর্জাতিক আইনের দায়িত্ব—এই তিনটি বিষয়কে এক জায়গায় এনে দিয়েছে।

বিশেষ করে ৩১ আগস্টের প্রসপেক্টাসের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটে আয়ারল্যান্ডের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। লুক্সেমবার্গ নবায়ন না করার অবস্থান নেওয়ার পর এখন প্রশ্ন হলো—ইসরায়েলি বন্ডের ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের পথ বন্ধ হবে, নাকি অন্য কোনো ইইউ রাষ্ট্রের মাধ্যমে কার্যক্রম চালু থাকবে। অ্যামনেস্টির ‘ইলেকট্রিক পিকনিক’ প্রচারণা মূলত এই সিদ্ধান্তের আগে জনমত ও রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোরই একটি কৌশল।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.