ইরানের ওপর নতুন করে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের মার্কিন পরিকল্পনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে তেহরান। শনিবার (২২ আগস্ট) দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনা জাতিসংঘের স্বাধীন সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ওপর মার্কিন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, এ ধরনের ‘সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার’ আন্তর্জাতিক আইনে কোনো ভিত্তি নেই।
ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখা দেশগুলোকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার সম্ভাবনায় চীনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট আগামী সোমবার ইরান নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে তিনি তেহরানের বিরুদ্ধে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা’ আরোপের হুমকি দিয়েছেন। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া দেশগুলোকেও ওয়াশিংটনের সঙ্গে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বিশেষ করে চীনকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়ছে। বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান কেপলারের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সমুদ্রপথে রপ্তানি করা তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনে থাকে চীন। তবে বেইজিং এ সংকটের কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধে যেসব দেশ সহযোগিতা করবে, তাদের স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে। তিনি আশপাশের দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ দিলে ইরান তাদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর প্রায় ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের প্রভাব ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। বর্তমানে দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি হামলা বন্ধ থাকলেও শান্তি আলোচনা শুরুর কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
যুদ্ধের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। বৃহস্পতিবার মাত্র চারটি পণ্যবাহী জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে। এগুলোর কোনোটিই বড় অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ বা এলএনজি ট্যাংকার ছিল না।
তবে বাগদাদের বারবার অনুরোধের পর কয়েকটি ইরাকি তেলবাহী জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে ইরান। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে, ইরাকি ট্যাংকারগুলোর চলাচলের অনুমতি ছিল ইরাকের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফের তেহরান সফরের অন্যতম প্রধান অনুরোধ।
মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর সহায়তায় গত সাত দিনে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৮০ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়েছে। যুদ্ধের আগে এই পথে প্রতিদিন ২ কোটি ব্যারেলের বেশি তেল পরিবহন হতো, যা বিশ্বের মোট তেল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের অর্থনীতি ও সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দেশটির হাতে এখনো পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা রয়েছে। এসব সক্ষমতা ব্যবহার করে তেলবাহী জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করা এবং আঞ্চলিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলা চালানোর ঝুঁকি রয়েছে।
ইরানের সামরিক বাহিনীর চিফ অব স্টাফ আবদোল্লাহি শনিবার একটি ভূগর্ভস্থ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কারখানা পরিদর্শন করেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত প্রতিবেদনে তিনি দাবি করেন, কারখানাটি আগের তুলনায় আরও উন্নত, বেশি সক্ষমতা ও বৃহৎ পরিমাণে সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন করতে পারছে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার গালিবাফ জানিয়েছেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছ থেকে তেহরান ‘অসংখ্য বার্তা’ পেয়েছে। তবে কোন কোন দেশ এসব বার্তা পাঠিয়েছে, তা তিনি জানাননি।
অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান যুদ্ধের অবসানে কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে মত দিয়েছেন। শুক্রবার ইরানের সংবাদ সংস্থা আইএসএনএকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, শক্তি ও মর্যাদা ধরে রেখে এখনই যুদ্ধ শেষ করা ভালো।
এদিকে যুদ্ধের শুরু থেকে ইরানে ব্যাপক প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। প্রথম দিনেই ইরানের ১৬৮ স্কুলশিশু নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তাদের ৭৫০-এর বেশি সামরিক সদস্য আহত এবং ১৮ জন নিহত হয়েছেন।
যুদ্ধের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস এবং দেশটির ধর্মীয় শাসকদের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের পরিবেশ তৈরিসহ কয়েকটি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন। তবে এসব লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.