বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর যৌথ উদ্যোগে রোববার (১৬ আগস্ট) রংপুরের আরডিআরএস গেস্ট হাউজে “বাংলাদেশের শিল্প জরিপ” নিয়ে একটি বিভাগীয় কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কর্মশালায় রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলার সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, শিক্ষক-গবেষক, চেম্বার অব কমার্সের প্রতিনিধিসহ অনেকে অংশ নেন।
সোমবার (১৭ আগস্ট) প্রতিষ্ঠানটি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
কর্মশালায় জরিপের উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা, সম্ভাবনাময় শিল্প ও বিনিয়োগের খাত চিহ্নিতকরণ, ব্যবসায়ীদের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা এবং তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ে সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা কামনা করা হয়।
‘বাংলাদেশের শিল্প জরিপ’ এডিবির অর্থায়নে বিডার একটি উদ্যোগ, যার কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে সানেম। জরিপটির লক্ষ্য বিনিয়োগকারীদের সমস্যা ও সম্ভাবনা চিহ্নিত করা, সেগুলো সমাধানে সহায়তা করা এবং বিনিয়োগ ও নীতি প্রণয়নে সহায়ক একটি হালনাগাদ তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা। এর অংশ হিসেবে দেশের আট বিভাগে ধারাবাহিকভাবে কর্মশালা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যার অংশ হিসেবে রংপুরে এ কর্মশালা আয়োজন করা হয়।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন রংপুর জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ক্রিস্টোফার হিমেল রিছিল। প্রধান অতিথি ছিলেন বিডার নির্বাহী সদস্য মো. হুমায়ুন কবির। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রংপুর বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মো. আশরাফুল ইসলাম ও রংপুর চেম্বারের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. মনজুর আহমেদ আজাদ। সম্মানিত অতিথি ছিলেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. শওকত আলী। অনুষ্ঠানে এডিবির পক্ষে বক্তব্য দেন পাবলিক সেক্টর ইকোনমিস্ট তসনিম আলম।
স্বাগত বক্তব্যে সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, জরিপের লক্ষ্য বাংলাদেশের শিল্প ও বিনিয়োগ পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরা। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের তথ্য এখন বিডাসহ বিভিন্ন সংস্থা, চেম্বার ও ব্যবসায়ী সংগঠনের কাছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। একটি নির্ভরযোগ্য, সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার হলে অগ্রাধিকারমূলক খাত চিহ্নিত করা এবং কোথায় বাড়তি নজর দরকার, তা বোঝা সহজ হবে।
বিডার ওয়ান স্টপ সার্ভিসের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এই জরিপ বিনিয়োগ সহায়তা আরও কার্যকর করার প্রচেষ্টার সঙ্গেও জড়িত। ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ওই দেশগুলোতে ওয়ান স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা একজায়গা থেকেই অনেক সুবিধা পান।
জরিপের পদ্ধতি তুলে ধরেন সানেমের প্রোগ্রাম পরিচালক জুবায়ের হোসেন। তিনি বলেন, জরিপে তিন ধরনের বিনিয়োগকারীকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যেগুলো হলো বিদেশি মালিকানাধীন, যৌথ উদ্যোগ ও দেশীয় প্রতিষ্ঠান। বিদেশি ও যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সরাসরি গিয়ে তথ্য নেওয়া হবে, দেশীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য হবে নমুনাভিত্তিক জরিপ। প্রতিষ্ঠান, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের তথ্যের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের সমস্যা ও সমাধানের উপায়ও জানার চেষ্টা করা হবে।
জুবায়ের হোসেন বলেন, বিডা, বেজা, বেপজা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে সানেমের করা প্রাথমিক ম্যাপিংয়ে দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠানের অবস্থানে বড় ধরনের অসমতা দেখা গেছে। সবচেয়ে বেশি শিল্প প্রতিষ্ঠান ঢাকায়, এরপর চট্টগ্রামে। সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রাথমিক ম্যাপিংয়ে রংপুরে খুবই কম শতাংশ প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
তিনি জানান, জরিপ শেষে এর ফল ও কর্মশালাগুলোর আলোচনা একটি প্রতিবেদন আকারে বিডাকে দেওয়া হবে। তবে পুরো বিনিয়োগকারী তথ্যভাণ্ডার সবার জন্য উন্মুক্ত নাও থাকতে পারে; এটি মূলত নীতি প্রণয়নে ব্যবহৃত হবে। এই উদ্যোগের আওতায় একটি “বিনিয়োগ কম্পেন্ডিয়াম”ও তৈরি হবে, যাতে থাকবে একটি সাধারণ অংশ ও খাতভিত্তিক অংশ। অংশগ্রহণকারীদের কর্মশালায় বিতরণ করা ফরমের মাধ্যমে মতামত জানানোর অনুরোধ জানান তিনি।
এডিবি বাংলাদেশের পাবলিক সেক্টর ইকোনমিস্ট তসনিম আলম বলেন, বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ এই জরিপের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। হাতে আছে প্রায় তিন বছর। এই সময়ের মধ্যে সঠিক চাহিদা নিরূপণ জরুরি। তিনি বলেন, বেসরকারি খাত মূলত নিজের চেষ্টাতেই টিকে আছে, তবে এখন ব্যবসা করার পরিবেশ আরও সহজ করার সময় এসেছে।
রংপুর প্রসঙ্গে তসনিম আলম বলেন, কৃষিনির্ভর এই বিভাগে অনেক সম্ভাবনা এখনো অব্যবহৃত। গ্যাস ও জ্বালানি-সংকটে ভারী শিল্প গড়ে তোলা কঠিন হওয়ায় তিনি অন্য খাতে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন। এলডিসি-পরবর্তী সময়ে কী ধরনের সহায়তা লাগবে, তা নির্ধারণে সঠিক তথ্য দেওয়ার জন্য কর্মশালার অংশগ্রহণকারীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (আরসিসিআই) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মনজুর আহমেদ আজাদ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, রংপুরের শিল্প সম্ভাবনা জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরা দরকার। এ জন্য আরসিসিআই সব ধরনের সহযোগিতা করবে বলে জানান তিনি।
রংপুর বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, দেশজুড়ে শিল্পের সমস্যা, সুযোগ ও বিনিয়োগ সম্ভাবনার একটি হালনাগাদ তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা জরুরি। সঠিক তথ্য পেলে সরকার ভালো নীতি প্রণয়ন করতে পারবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। উত্তরাঞ্চলের অংশীজনদের প্রতি তাঁর আহ্বান, নিজেদের এলাকার বাস্তবতা মাথায় রেখে বিকল্প বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজে বের করা।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. শওকত আলী আঞ্চলিক বৈষম্যের প্রসঙ্গ তুলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পের মধ্যে সংযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি রংপুরের সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে কৃষি ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ, বিশেষ করে আলু ও ভুট্টার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, পর্যাপ্ত হিমাগার না থাকায় উৎপাদন বেশি হলে আলুর দাম পড়ে যায় ও নষ্ট হয় প্রচুর পরিমাণে। ভুট্টা থেকে পপকর্নের মতো প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরির সুযোগ আছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিনিয়োগকারী ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা দরকার বলে মন্তব্য করেন বিডার নির্বাহী সদস্য মো. হুমায়ুন কবির। তিনি “ইনভেস্ট বাংলাদেশ” উদ্যোগের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, এর মাধ্যমে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত সব সেবা আনা হচ্ছে একই প্ল্যাটফর্মে। মো. হুমায়ুন কবির বলেন, “বাংলাদেশের শিল্প জরিপ” শুধু বিদেশি, যৌথ উদ্যোগ ও দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি আঞ্চলিক বিনিয়োগ পরিস্থিতিও তুলে ধরবে। কেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্ত গ্রহণে আঞ্চলিক বাস্তবতা প্রায়ই উপেক্ষিত হয় বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন।
কর্মশালার সভাপতি ক্রিস্টোফার হিমেল রিছিল বলেন, শতরঞ্জি ও হাড়িভাঙ্গা আম রংপুরের জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) পণ্য। শতরঞ্জি বর্তমানে প্রায় ৫০টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে বলে জানান তিনি। দুগ্ধ ও তামাক শিল্পকেও সম্ভাবনাময় বিনিয়োগক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি, পাশাপাশি রংপুরের আরএফএল ও শ্যামপুর চিনিকলের কথাও বলেন।
উন্মুক্ত আলোচনায় রংপুর ও আশপাশের জেলাগুলোর বিনিয়োগ সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। এতে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ, নারী উদ্যোক্তা, ঐতিহ্যবাহী শিল্প, অর্থায়ন, অবকাঠামো, জ্বালানি, পরিবহন ও রপ্তানি বহুমুখীকরণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, এই অঞ্চলের কৃষিই শিল্পের সবচেয়ে বড় অব্যবহৃত সম্ভাবনা। দিনাজপুরের লিচু ও কাটারিভোগ চাল, রংপুরের হাড়িভাঙ্গা আম, আলু, ভুট্টা, তামাক ও ড্রাগন ফলের মতো ফসলে মূল্য সংযোজন ও রপ্তানি বাড়ানোর ওপর জোর দেন তাঁরা। পার্বতীপুরে বেবি কর্ন প্রক্রিয়াকরণ ও গাইবান্ধায় আনারস প্রক্রিয়াকরণ এবং রাইস ব্র্যান তেল উৎপাদনকে সফল উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
আলোচনায় রপ্তানি বাজারে প্রবেশাধিকার সীমিত থাকার বিষয়টিও ওঠে। আলু রপ্তানিতে ভারতীয় বাজারে প্রবেশাধিকারের প্রসঙ্গ তোলেন অংশগ্রহণকারীরা। পাটজাত পণ্যকে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার, প্রক্রিয়াজাত লিচু আর পাঁপড় বিদেশে রপ্তানি করার কথাও বলা হয়, যা নারীদের কর্মসংস্থান বাড়াতে পারে বলে মত দেন বক্তারা। এছাড়াও, শতরঞ্জি, বেনারসি, কাঠের পুতুল, মণিপুরী শাড়ির মতো ঐতিহ্যবাহী ও কুটির শিল্পে নতুন কিছু করার সুযোগ, ভালো বাজার, আর প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পেলে নারীদের কাজের সুযোগ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করা হয়।
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও রপ্তানি বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর দাবি ওঠে আলোচনায়। বেনারসি পল্লী ও নিশবেতগঞ্জের শতরঞ্জি শিল্পের ক্রমাবনতিশীল অবস্থা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন অংশগ্রহণকারীরা। আলোচনায় বলা হয়, সহজে ঋণ না পাওয়া বিনিয়োগের একটি বড় বাধা। সুদহার কমানো গেলে প্রক্রিয়াকরণ ও হিমাগারের মতো অবকাঠামোয় বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে বলে মত দেন বক্তারা। অনির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ শিল্পের জন্য বড় খরচের কারণ বলে উল্লেখ করা হয়। ভালো সড়ক যোগাযোগ, লজিস্টিকস সুবিধা ও একটি কনটেইনার ডিপো স্থাপনের প্রস্তাব দেন অংশগ্রহণকারীরা।
পাট শিল্পকেও সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে তুলে ধরা হয়, তবে ভালো মানের পাট পাওয়া ও বাজারজাত করায় চ্যালেঞ্জের কথাও বলা হয়। রংপুর, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ের একাধিক চিনিকল বন্ধ বা অব্যবহৃত অবস্থায় থাকার বিষয়টিও আলোচনায় আসে, পাশাপাশি দিনাজপুরের বস্ত্রকলগুলোর সম্ভাবনার কথাও বলা হয়। আঞ্চলিক বৈষম্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অংশগ্রহণকারীরা। রংপুর ও চট্টগ্রামের মতো এলাকার মধ্যে বিনিয়োগ ও বাজেট বরাদ্দের ফারাক আঞ্চলিক বৈষম্য বাড়াচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তাঁরা। বিসিকের একজন প্রতিনিধি “এক গ্রাম, এক পণ্য” উদ্যোগের কথা তুলে ধরে বলেন, পীরগঞ্জে মানুষের চুল দিয়ে তৈরি পণ্য মধ্যপ্রাচ্যের বাজারেও পৌঁছাচ্ছে।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.