পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান আকাক্সক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশ আর কখনোই ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ হবে না। জুলাই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান আকাক্সক্ষা ছিল, বাংলাদেশ যেন আর কখনো ক্লায়েন্ট স্টেটে পরিণত না হয়।
বুধবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই আন্দোলনের সাফল্য বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের ক্ষেত্রে জাতির ওপর একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব অর্পণ করেছে। শুরু থেকেই আমাদের সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ছিল বাংলাদেশ ফার্স্ট। আমরা আর কখনো বাংলাদেশকে ক্লায়েন্ট স্টেটে পরিণত হতে দেব না। কখনোই না।
খলিলুর রহমান বলেন, সম্প্রতি তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে বলেছেন, একসময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে হারিয়ে যেতে দেখা যাচ্ছিল। তবে এখন দেশটি শক্তভাবে ফিরে এসেছে। এমন মন্তব্য আন্তর্জাতিক পরিসরে নতুন করে বাংলাদেশের মর্যাদা অর্জনের প্রতিফলন। জুলাই আন্দোলনের অর্জন সরকার ও জনগণের ওপর গভীর দায়িত্ব সৃষ্টি করেছে। আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের সংগ্রামে তারা জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাদের অসাধারণ সাহস, দেশপ্রেম এবং অটল বিশ্বাস আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে একই সঙ্গে তিনি আন্দোলনে আজীবনের জন্য আহতদের প্রতিও গভীর সহমর্মিতা জানান।
২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহ স্মরণ করে খলিলুর বলেন, সারা দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর একটি। এর আগে তিনি কখনও দেশকে এমন সম্পূর্ণ তথ্যবিচ্ছিন্ন হতে দেখেননি। বাংলাদেশে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলের নজরে আনতে তিনি ৫ আগস্ট জাতিসংঘ মহাসচিবের দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমার বিশ্বাস, পরবর্তীতে সেই উদ্যোগ দেশের রাজনৈতিক রূপান্তরের গতি ত্বরান্বিত করতে আংশিকভাবে হলেও ভূমিকা রেখেছিল। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী উত্তরণপর্বে তিনটি প্রধান অগ্রাধিকার ছিল। সেগুলো হল-তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জাতীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা। নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও সরকার সফলভাবে এই তিনটি লক্ষ্যই অর্জন করেছিল।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের মূল্যায়নের উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্যভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পথ সুগম হয়েছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্ব লাভে বাংলাদেশের সফল প্রচারের প্রসঙ্গ তুলে ড. খলিলুর বলেন, সরকার এমন একটি দায়িত্ব নিয়েছিল, যা শুরুতে প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হয়েছিল। ফিলিস্তিন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার নির্দেশ দেন। আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলাম, আপনি আমাদের একটি অসম্ভব দায়িত্ব দিচ্ছেন। জবাবে তিনি বলেন, ‘অসম্ভব দায়িত্ব পালনের জন্যই ফরেন অফিস রয়েছে।
খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলো এবং নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের নিরলস প্রচেষ্টায় এ বিজয় অর্জিত হয়েছে। এই সাফল্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ক্যাডারের সক্ষমতা ও পেশাদারিত্বের প্রমাণ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের প্রথম বড় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি যথাযথ সম্মান জানাতে দেশপ্রেম, সততা ও দায়বদ্ধতার সঙ্গে দেশকে রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ‘আমাদের সাহসী তরুণরা নিপীড়কদের হাত থেকে এই দেশকে মুক্ত করে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে। ভালোবাসা, প্রজ্ঞা ও নিষ্ঠা দিয়ে বাংলাদেশকে সংরক্ষণ ও এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব এখন আমাদের।’



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.