ভারতের বিমান পরিবহন খাতে নতুন এয়ারলাইন চালুর করছে আদানি গ্রুপ

ভারতের বিমান পরিবহন বাজারে নতুন এয়ারলাইন চালুর চিন্তা-ভাবনা করছে ভারতীয় ধনকুবের গৌতম আদানির মালিকানাধীন আদানি গ্রুপ। বিষয়টির সঙ্গে সরাসরি অবগত দুটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স। আদানি গ্রুপের এই পদক্ষেপ দেশটির বিমান পরিবহন খাতে প্রতিযোগিতার সমীকরণ বদলে দিতে পারে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদানি গ্রুপ বর্তমানে মুম্বাইয়ের দুটিসহ ভারতে মোট ৮টি বিমানবন্দর পরিচালনা করছে এবং এভিয়েশন খাতে ১ হাজার ১০০ কোটি ডলারের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও এর আগে গোষ্ঠীটি জানিয়েছিল, বিমান পরিবহন ব্যবসা বা এয়ারলাইন চালু করার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। ফলে নতুন এই চিন্তাভাবনা তাদের পূর্ববর্তী কৌশলে পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে।

বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই সূত্রের একজন বলেন, এ বিষয়ে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এয়ারলাইন ব্যবসাকে ঝুঁকিপূর্ণ এবং কম মুনাফার খাত হিসেবে বিবেচনা করায় বিষয়টি এখনও পর্যালোচনায় রয়েছে।

ওই সূত্র জানান, গত বছর আহমেদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়ার প্রাণঘাতী বিমান দুর্ঘটনা, পরবর্তী কঠোর নজরদারি এবং ডিসেম্বরে বাজারসেরা ইন্ডিগোর অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে দেশজুড়ে বড় ধরনের ফ্লাইট বিপর্যয় ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের সরকার আদানিসহ কয়েকটি বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীকে নিজস্ব এয়ারলাইন চালুর বিষয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে উৎসাহিত করেছে।

তিনি বলেন, এটি একটি কঠিন ব্যবসা। তবে জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করে আদানি গ্রুপ বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছে। কারণ সরকার মনে করছে, এয়ার ইন্ডিয়ার দুর্দশা এবং ইন্ডিগোর সংকটের পর বাজারে আরও একটি বড় এয়ারলাইনের প্রয়োজন রয়েছে।

আদানি গ্রুপের এয়ারলাইন ব্যবসায় নামার সম্ভাবনার প্রভাব পড়েছে দেশটির শেয়ারবাজারেও। বৃহস্পতিবার আদানি এন্টারপ্রাইজের শেয়ারের দর ৩ শতাংশের বেশি কমেছে। তবে নতুন বিমান সংস্থা চালুর বিষয়ে গোষ্ঠীটির অভ্যন্তরীণ আলোচনা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।

বর্তমানে প্রায় ৮ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের সম্পদের মালিক গৌতম আদানি। তিনি এশিয়ার দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী ব্যক্তি। বিমান পরিবহন খাতে প্রবেশ তার ব্যবসায়িক জীবনের অন্যতম বড় পদক্ষেপ হতে পারে।

রয়টার্স বলছে, অতিরিক্ত করের বোঝা, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সংকটের কারণে গত ১৫ বছরে কিংফিশার, জেট এয়ারওয়েজ এবং গো ফার্স্টের মতো বড় ভারতীয় বিমান সংস্থাগুলো দেউলিয়া হয়ে গেছে।

অন্যদিকে সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দরের মতো খাতে দ্রুত ব্যবসা সম্প্রসারণ করলেও ২০২৪ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে একটি সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প পাওয়ার জন্য ঘুষের অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন গৌতম আদানি। তবে সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে আনা সেই অভিযোগ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তিনি স্বস্তি পেয়েছেন।

ভারত বিশ্বের অন্যতম দ্রুতবর্ধনশীল বিমান পরিবহন বাজার হলেও দেশটিতে দুটি সংস্থার একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। দেশটির সবচেয়ে বড় বিমান সংস্থা ইন্ডিগোর দখলে রয়েছে ৬৫ দশমিক ৪ শতাংশ অভ্যন্তরীণ বাজার। আর এয়ার ইন্ডিয়ার দখলে রয়েছে ২৫ শতাংশ বাজার।

আকাশপথে যাত্রীসংখ্যা বৃদ্ধি এবং বোয়িং ও এয়ারবাসের কাছে বিমান সংস্থাগুলোর রেকর্ডসংখ্যক নতুন বিমানের অর্ডারের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর ভারত সরকার জানায়, ২০৪৭ সালের মধ্যে দেশটিতে বিমানবন্দরের সংখ্যা ২০১৪ সালের ৭৪টি থেকে বাড়িয়ে ৩৫০ থেকে ৪০০টিতে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।

ভারতে কাতার এয়ারওয়েজের সাবেক প্রধান রাজন মেহরা বলেন, আদানির এই পদক্ষেপে ভারতের বিমান পরিবহন খাতের চিত্র বদলে যেতে পারে। তবে সব এয়ারলাইনের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত এবং শক্তিশালী নীতিগত সুরক্ষা বলয় গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা দ্বিতীয় সূত্র জানান, আদানি যেসব বিকল্প বিবেচনা করছেন, তার মধ্যে একটি হলো ইতোমধ্যে চালু থাকা কোনো এয়ারলাইনের শেয়ার কিনে নেওয়া। তার ভাষায়, এই মুহূর্তে সব ধরনের সুযোগই গোষ্ঠীটির বিবেচনায় রয়েছে।

গত বছরের ডিসেম্বরে পাইলট সংকটের কারণে হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল করায় ইন্ডিগোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার। পরে বিমান টিকিটের মূল্যসীমাও নির্ধারণ করে সরকার।

এদিকে গত বছর ড্রিমলাইনার দুর্ঘটনায় ২৬০ জনের মৃত্যুর পর থেকে লোকসানে থাকা এয়ার ইন্ডিয়া ব্যাপক তদন্তের মুখে পড়েছে এবং সংস্থাটি একাধিক নিরীক্ষা ত্রুটির সম্মুখীন হয়েছে। অপেক্ষাকৃত ছোট বিমান সংস্থা স্পাইসজেটও তীব্র আর্থিক সংকট ও কর্মচারীদের বেতন বকেয়া সমস্যায় ভুগছে।

এয়ার ইন্ডিয়া ভারতের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয়। তবে আদানির সম্ভাব্য আগমনের খবরে বৃহস্পতিবার মুম্বাইয়ের শেয়ারবাজারে ইন্ডিগোর শেয়ারের দাম ১ শতাংশের বেশি কমেছে। অন্যদিকে স্পাইসজেটের শেয়ারের দাম ১০ শতাংশ বেড়েছে।

আদানি এয়ারপোর্টের পরিচালক এবং গৌতম আদানির ছোট ছেলে জিৎ আদানি গত ডিসেম্বরে রয়টার্সকে বলেছিলেন, বিমান পরিবহন ব্যবসা নিয়ে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। কারণ এতে লাভের পরিমাণ অত্যন্ত কম এবং বিমান সংস্থা পরিচালনার জন্য যে মানসিকতা দরকার, তা তাদের নেই।

তিনি আরও বলেছিলেন, তাদের মূল দক্ষতা ভূমিতে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো তৈরি এবং তা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা। এরপরও এভিয়েশন অবকাঠামো খাতে বড় বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে আদানি গ্রুপ। আদানি এয়ারপোর্টস গত মাসে জানিয়েছে, ভারতের ছয়টি স্থানে হোটেল, খুচরা বিক্রয় কেন্দ্র এবং অফিস স্পেসসহ বিমানবন্দর-সংলগ্ন বাণিজ্যিক এলাকা গড়ে তুলতে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করবে।

বৃহস্পতিবার দেশটির সংবাদমাধ্যম দ্য ইকোনমিক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমানবন্দর পরিচালনাকারী কোনো প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত বিমান সংস্থায় শেয়ারহোল্ডার হতে পারবে না—আইনের এই শর্ত শিথিলের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছে আদানি গ্রুপ।

স্বতন্ত্র বিমান পরিবহন বিশ্লেষক ব্রেন্ডন সোবি বলেন, কিরগিজস্তান, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মতো দেশে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব এয়ারলাইন পরিচালনার উদাহরণ রয়েছে। তবে ভারতের অন্যান্য বিমান সংস্থা স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কা থেকে বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়াই স্বাভাবিক।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.