দেশের বীমা খাতে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে ন্যায্যতা, জবাবদিহি, সুশাসন, পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন এবং কার্যকর বাজারভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিনের দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ও সুশাসনের অভাবে বীমাসহ আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা কমেছে। এ অবস্থায় গ্রাহকের অধিকার নিশ্চিত করতে শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।’
গতকাল রাজধানীর বিজয়নগর হোটেল একাত্তরে ইন্স্যুরেন্স রিপোর্টার্স ফোরাম (আইআরএফ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বীমা খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক বাজেট-পরবর্তী এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা।
আইআরএফ সভাপতি গোলাম মওলার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) সভাপতি ও জাতীয় সংসদ সদস্য সাঈদ আহমেদ এবং বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের (বিআইএফ) সভাপতি বিএম ইউসুফ আলী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দৈনিক যুগান্তরের বিজনেস এডিটর ও আইআরএফের সিনিয়র সদস্য মনির হোসেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন দৈনিক বাণিজ্য প্রতিদিনের সম্পাদক ও আইআরএফের সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন।
ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘সরকার অতিনিয়ন্ত্রণে বিশ্বাসী নয়। তবে গ্রাহকের অধিকার রক্ষায় শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক ও বাজারভিত্তিক নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রয়োজন। তিনি বীমা কোম্পানিতে লুটপাট ও মালিকানার অপসংস্কৃতি বন্ধ, কৃষি ও স্বাস্থ্যবীমাসহ নতুন পণ্যের সম্প্রসারণ, পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ দুর্যোগপ্রবণ দেশ হলেও কৃষি বীমার প্রসার খুবই সীমিত। একইভাবে স্বাস্থ্যবীমাও সীমিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার ছাড়া গ্রাহকসেবা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।’
আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, বীমা খাত সংস্কারে গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধার, খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ভিত্তি গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার অনিষ্পন্ন দাবি নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা, ডিজিটাল রূপান্তর ও মাইক্রোইন্স্যুরেন্স সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও জাতীয় সংসদ সদস্য সাঈদ আহমেদ বলেন, ‘বীমা কমিশনকে ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও অনিয়ম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখতে হবে। একই সঙ্গে মোটরযান বীমা বাধ্যতামূলক করা এবং নতুন খাতে বীমা সেবা সম্প্রসারণের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।’
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের সভাপতি বিএম ইউসুফ আলী বলেন, ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বীমা খাতকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও গ্রাহকবান্ধব করতে সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বীমা কোম্পানিগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, ‘দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বীমার প্রবেশযোগ্যতা এখনো কম। দুর্বল নিয়ন্ত্রণ, সুশাসনের অভাব ও স্বল্পমেয়াদি লাভের প্রবণতা কাটিয়ে কৃষি ও জলবায়ুভিত্তিক বীমা সম্প্রসারণের ওপর তিনি জোর দেন।’
জেনিথ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম নুরুজ্জামান বলেন, ‘সাধারণ বীমার তুলনায় জীবন বীমা খাতের সংকট বেশি। সম্পদ বিক্রির জটিলতা দূর এবং ব্যাংকঋণ সহজলভ্য হলে এ সংকট অনেকটাই কমবে।’ মূল প্রবন্ধে মনির হোসেন বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বীমা খাতের আধুনিকায়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং গ্রাহকবান্ধব সেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.