সংকটকালীন যোগাযোগ নিয়ে গবেষণা; আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেলেন চার যোগাযোগ গবেষক

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকারের সংকটকালীন যোগাযোগ (ক্রাইসিস কমিউনিকেশন) নিয়ে গবেষণার জন্য চার বাংলাদেশি যোগাযোগ গবেষক আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছেন।

পুরস্কারপ্রাপ্ত গবেষকরা হলেন— ড. নাজমা আখতার, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলাইনা উইলমিংটনের কমিউনিকেশন স্টাডিজ বিভাগের নবনিযুক্ত সহকারী অধ্যাপক; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ক্যানবেরার পিএইচডি গবেষক মো. সাঈদ আল-জামান; যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা আটলান্টিক ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ড. খায়রুল ইসলাম; এবং ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়ার পিএইচডি গবেষক এ কে এম জামীর উদ্দীন।

সংকটকালীন যোগাযোগে সরকার-গণমাধ্যম সম্পর্ক: বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর জেট বিমান দুর্ঘটনার একটি কেস স্টাডি (Government–Media Dynamics in Crisis Communication: A Case Study of Bangladesh Air Force Jet Crash) শীর্ষক গবেষণাপত্রের জন্য তারা ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিকেশন অ্যাসোসিয়েশন (ICA)-এর টপ পেপার অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। আইসিএ বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ ও গণমাধ্যম গবেষণার অন্যতম শীর্ষ সংগঠন হিসেবে পরিচিত।

দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউনে ২০২৬ সালের ৪ থেকে ৮ জুন অনুষ্ঠিত আইসিএর ৭৬তম বার্ষিক সম্মেলনে এ পুরস্কার প্রদান করা হয়। এই বছর বিশ্বের প্রায় ৩,৪০০ যোগাযোগ গবেষক ও শিক্ষাবিদ এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন।

গবেষণাটিতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর সরকার ও জাতীয় গণমাধ্যম কীভাবে জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এ উদ্দেশ্যে গবেষকরা সরকারি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি এবং দেশের প্রধান সংবাদপত্রগুলোতে প্রকাশিত ৫০০-এরও বেশি সংবাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেন।

গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর জন্য উচ্চঝুঁকিপূর্ণ সরকারি সংকট মোকাবিলায় একটি কার্যকর যোগাযোগ কাঠামো তৈরি করা। গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে তারা “Care-Centered Government Crisis Communication Framework” নামে একটি নতুন তাত্ত্বিক কাঠামো প্রস্তাব করেন। এতে সহমর্মিতা, মানবিকতা, নৈতিক জবাবদিহিতা এবং দ্রুত ও নির্ভুল তথ্য সরবরাহকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

গবেষকদের মতে, বাংলাদেশসহ বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোতে সংকটকালীন সরকারি যোগাযোগ সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি চলমান অবিশ্বাস, গণতান্ত্রিক চর্চার বিকাশমান অবস্থা এবং সাংস্কৃতিক প্রত্যাশা—এসব বিষয়ে সংকটের সময়ে সরকার, গণমাধ্যম ও নাগরিকদের পারস্পরিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, কার্যকর সংকটকালীন যোগাযোগ কেবল তথ্য প্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্বচ্ছতা ও মানবিকতাভিত্তিক যোগাযোগ জনগণের আস্থা বৃদ্ধি, সরকার-গণমাধ্যম সম্পর্ক উন্নয়ন এবং জাতীয় সংকটকালে প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষকরা আশা প্রকাশ করেছেন, তাদের প্রস্তাবিত কাঠামো নীতিনির্ধারক, সরকারি কর্মকর্তা এবং যোগাযোগ পেশাজীবীদের জন্য একটি কার্যকর নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর সংকট মোকাবিলা কৌশল আরও কার্যকর করতে সহায়ক হবে।

গবেষক দলের সদস্য এ কে এম জামীর উদ্দীন বলেন, এ গবেষণা বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান ও করপোরেট সংস্থাগুলোকে সংকটকালে আরও কার্যকর যোগাযোগ কৌশল প্রণয়নে সহায়তা করবে

তিনি বলেন, বাংলাদেশে সংকটকালীন যোগাযোগ বিষয়ে গবেষণার সংখ্যা এখনও সীমিত। ফলে এ গবেষণা দেশের প্রেক্ষাপটে নতুন জ্ঞান ও দিকনির্দেশনা প্রদান করবে।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের মিজৌরি স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে জন বোরহিস এক্সেলেন্স ইন রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড অর্জনকারী জামীর উদ্দীন বলেন, গবেষণাটি বাংলাদেশে লাভজনক ও অলাভজনক উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংকট ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বাড়াতে এবং জনআস্থা ও সুনাম রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে

 

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.