দেশের লোহা ও ইস্পাত পণ্য উৎপাদনকারী শিল্পমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশন (বিএসএমএ) বিদ্যুতের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংগঠনটি বিদ্যুতের বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
সোমবার (৮ জুন) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। এতে মূল বক্তব্য তুলে ধরেন বিএসএমএ’র প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল ড. সুমন চৌধুরী ও পরিচালক এস কে মাসাদুল আলম মাসুদ।
সংবাদ সম্মেলনে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বিদ্যুতের সাম্প্রতিক মূল্য বৃদ্ধির কারণে প্রতি টন স্টিল পণ্যের উৎপাদন ব্যয় ১ হাজার ৭৮৫ টাকা বাড়বে। এছাড়া সমুদ্রবন্দরের বিভিন্ন চার্জ বৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের মূল্য ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিসহ নানা কারণে প্রতি টন স্টিল পণের জন্য আরও ৩ হাজার ৫৬০ টাকা ব্যয় বাড়তে পারে। সব মিলিয়ে এক টন রডে ৫ হাজার টাকার বেশি উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। কিন্তু মূল্য বাড়িয়ে ক্রেতা বা রড ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে এ টাকা আদায় করার তেমন সুযোগ নেই। কারণ রডের মূল্য বাড়ানো হলে তা ব্যবহারকারীদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে, বাজারে চাহিদা কমবে। অন্যদিকে মূল্য না বাড়ালে কোম্পানিগুলোকে লোকসান গুণতে হবে। এত লোকসান দিয়ে টিকে থাকা হবে অনেক কঠিন।
তিনি বলেন, স্টিল শিল্প বিদ্যুত খাতের সবচেয়ে বড় ভোক্তা। কারখানাগুলো সরাসরি ৩৩ কেভি, ১৩২ কেভি এমনকি ২৩০ কেভি সঞ্চালনলাইন থেকে সরাসরি সংযোগ নিয়েছে। কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজস্ব সাবস্টেশন নির্মাণ করেছে। এই খাতের কারখানাগুলোর কাছে বিদ্যুৎ বিক্রির জন্য বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর কোনো সঞ্চালন ব্যয়ের প্রয়োজন হয় না, কোনো সিস্টেম লসও নেই। তাই এদের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো মুনাফা করছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানীতে কমিশন তা স্বীকারও করেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও অন্যদের পাশাপাশি স্টিল শিল্পের জন্যেও বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানো হয়েছে, যা খুবই হতাশার বিষয়।
বিসিএমএ প্রেসিডেন্ট বলেন, বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বছরে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার অপচয় হচ্ছে, যা জাতীয় বাজেটের প্রায় ৭ শতাংশ। সরকার এই অপচয় বন্ধের কার্যকর কোনো উদ্যোগ না নিয়ে ভর্তুকী দায় চাপাচ্ছে শিল্প খাতের উপর, যা খুবই দুঃখজনক। ।
তিনি বলেন, আগামী বাজেটেও স্টিল শিল্পে ভ্যাট ও কর বাড়ানো হতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে। এমনটি হলে তা হবে মরার উপর খাঁড়ার ঘা। তাতে এই শিল্প আর টিকে থাকতে পারবে না, ধীরে ধীরে বিভিন্ন কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। কোম্পানিগুলো ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে দেওলিয়া হয়ে যাবে, কাজ হারাবে হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারি। সামগ্রিক অর্থনীতির উপর চাপ বাড়বে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, স্টিল শিল্প বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ১ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগসমৃদ্ধ এই শিল্পখাত দেশের সেতু, ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল, রেলপথ, সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর, আবাসন ও শিল্পকারখানা নির্মাণে অপরিহার্য কাঁচামাল সরবরাহ করে। একই সঙ্গে এই খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। সরকার প্রতিবছর এ খাত থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব অর্জন করে থাকে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, বর্তমানে দেশের স্টিল শিল্প বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি। নির্মাণখাতে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা, বাজারে চাহিদা হ্রাস, উচ্চ সুদহার, টাকার অবমূল্যায়ন, ডলার সংকট, এলসি খোলার জটিলতা, কার্যকরী মূলধনের ঘাটতি, গ্যাস সরবরাহ সংকট এবং ক্রমবর্ধমান পরিবহন ও লজিস্টিক ব্যয় স্টিল শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য টিকে থাকাকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৪০টি আধুনিক স্টিল মিল এবং ১৫০টিরও বেশি রি-রোলিং মিল কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা বছরে প্রায় ১২.২ মিলিয়ন মেট্রিক টন। অথচ দেশের বর্তমান বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৫ মিলিয়ন মেট্রিক টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে অধিকাংশ কারখানা বর্তমানে তাদের উৎপাদন সক্ষমতার ৫০ শতাংশেরও কম ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের নতুন মূল্যবৃদ্ধি শিল্পখাতের ওপর আরও একটি বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে দেশের মোট স্টিল ব্যবহারের প্রায় ৬০ শতাংশ বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহৃত হয়। ফলে স্টিলের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি মানেই সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যয় বৃদ্ধি। অর্থাৎ বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ফলে সরকারকেই উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হবে, যা সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়ন ব্যয়কে আরও বৃদ্ধি করবে। আমরা বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সচেতন। তবে বিদ্যুৎ খাতের কাঠামোগত অদক্ষতা, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতার আর্থিক বোঝা উৎপাদনশীল শিল্পখাতের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনো টেকসই বা কার্যকর সমাধান হতে পারে না। এতে শিল্প উৎপাদন কমবে, নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে, কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং দেশের শিল্পখাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। বাংলাদেশের স্টিল শিল্প দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্পখাত এবং শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই শিল্পকে দুর্বল করা মানে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ভিত্তিকে দুর্বল করা।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.