স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতির সময় তিন বছর বাড়ানোর বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান জানিয়েছে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। সংস্থাটি বাংলাদেশের অনুরোধ অনুযায়ী প্রস্তুতির মেয়াদ ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বৃদ্ধির পক্ষে মত দিয়েছে।
মঙ্গলবার (২ জুন) অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়।
এতে বলা হয়, সিডিপির চেয়ারম্যান অধ্যাপক হোসে আন্তোনিও ওকাম্পো বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারকে অবহিত করেছেন। কমিটির মূল্যায়ন অনুযায়ী, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ সময় বৃদ্ধি করলে তা যথাযথ হবে। তবে এ সময়ের মধ্যে দেশের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সরকার এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির সময় তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত করার অনুরোধ জানায়। পরে ৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সহযোগিতা চেয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে চিঠি পাঠান।
সিডিপির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের তিনটি সূচকেই নির্ধারিত সীমা উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে অতিক্রম করেছে। নিকট ও মধ্যমেয়াদে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিও খুবই কম। তবে মধ্যপ্রাচ্য সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থার অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিবেশের পরিবর্তন উত্তরণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।
কমিটি মনে করে, প্রস্তুতির সময় বাড়ানো হলে বৈশ্বিক পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে বিশ্লেষণ, অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং উত্তরণ-পরবর্তী সুবিধা ও আন্তর্জাতিক সহায়তার জন্য যথাযথ প্রস্তুতির সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে সহজ শর্তে অর্থায়ন, কারিগরি সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বৈশ্বিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে সিডিপি। এ ছাড়া আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, কর আহরণ বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, অর্থনীতির বহুমুখীকরণ এবং বেসরকারি খাতকে প্রস্তুত করার মতো সংস্কার কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি।
সরকার সিডিপির এই মূল্যায়নকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও চলমান সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশ সফল ও টেকসই এলডিসি উত্তরণ নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে।
চলতি বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় নির্ধারিত রয়েছে। বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালে সিডিপির ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়। সূচকগুলো হচ্ছে মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা। ২০২১ সালে দেওয়া সিডিপির সুপারিশ অনুসারে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হওয়ার কথা। তবে অতিমারি করোনার কারণে উত্তরণ দুই বছর পেছানো হয়।
ব্যবসায়ী মহল অনেক দিন ধরেই এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা আরও অন্তত তিন বছর বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছে।
সিডিপি চেয়ারম্যানের কাছে ইআরডি সচিবের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতির স্বীকৃতি এবং কভিড-১৯ অতিমারির নজিরবিহীন প্রভাব থেকে পুনরুদ্ধারে সহায়তার জন্য মোট পাঁচ বছর সময় দেওয়ায় বাংলাদেশ গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। তবে এই সময়ের মধ্যে একের পর এক দেশি ও আন্তর্জাতিক সংকটে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়েছে। উত্তরণের প্রস্তুতি চলাকালে বৈশ্বিক ও জাতীয় প্রেক্ষাপট অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ছিল।
চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশ উত্তরণের তিনটি মানদণ্ড পূরণ করেছে। কিন্তু ধারাবাহিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যায় প্রস্তুতি প্রচণ্ডভাবে ব্যাহত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে কভিড-১৯-এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও ধীরগতির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও তার প্রভাবে জ্বালানি ও খাদ্যের বিশ্ববাজারে অস্থিরতা, বৈশ্বিক আর্থিক পরিস্থিতি, মধ্যপ্রাচ্য ও লোহিত সাগর অঞ্চলে সংঘাত, বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা বাড়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, দেশের অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে বিগত সময়ে আর্থিক খাতে অনিয়ম ও গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের প্রভাব, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অনিষ্পন্ন থাকা ও এজন্য জাতীয় বাজেট থেকে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে চিঠিতে।
চিঠিতে বলা হয়, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ এসব কারণে সামষ্টিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা, জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বেসরকারি-সরকারি বিনিয়োগ ও কর-জিডিপি অনুপাতে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ, মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি ও বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ব্যাংক খাত ও পুঁজিবাজারও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ইআরডি সচিব চিঠিতে বলেন, এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট ও আর্থিক খাতের ভঙ্গুরতা দারিদ্র্য হ্রাসের প্রবণতাকে উল্টো দিকে ঠেলে দিয়েছে। ফলে নীতিগত মনোযোগ স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও সংকট ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীভূত করতে হয়েছে। এটি মসৃণ এলডিসি-উত্তরণ কৌশলের (এসটিএস) অগ্রাধিকারমূলক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন সীমিত করেছে। কাঠামোবদ্ধ প্রস্তুতির জন্য পাঁচ বছরের যে সময় নির্ধারিত ছিল, তা মূলত ব্যয় হয়েছে সংকট মোকাবিলা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টিকে থাকার সংগ্রামে।
চিঠিতে বলা হয়, এলডিসি-পরবর্তী বাণিজ্য ও বাজার-সুবিধাসংক্রান্ত অনিশ্চয়তাও বেড়েছে। তৈরি পোশাক খাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়া নিয়ে সম্ভাব্য জটিলতা, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপ ইত্যাদি কারণে এ অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বর্তমান সময়সূচি অনুযায়ী এলডিসি থেকে উত্তরণ এগিয়ে নিলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য হ্রাসে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সরকার মনে করছে। এ অবস্থায় চলমান অর্থনৈতিক সমস্যা কাটিয়ে ওঠা ও সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে উল্লেখযোগ্য সময় ও প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
তাই এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির সময় ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছেন ইআরডি সচিব। তিনি বলেন, এতে সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল করা, সংস্কার জোরদার এবং এসটিএসের অগ্রাধিকারমূলক কাজ সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত পরিসর তৈরি হবে। সেই সঙ্গে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উত্তরণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.