বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও কথা বলার আহ্বান জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ‘বেসরকারি খাতেরও কথা বলা দরকার। তাদের দায়িত্ব আছে। বেসরকারি খাত নিরাপদ দূরত্বে বসে থাকতে পারে না। কোন কোন জায়গায় সমস্যা হয়েছিল, কেন হয়েছিল, সেগুলো আপনাদের বলতে হবে।’
শুক্রবার (২২ মে) সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি হোটেলে ‘পোস্ট-আপরাইজিং ইকোনমি অ্যান্ড জিওপলিটিকস অব বাজেট, রেমিনিসিং দ্য লিগ্যাসি অব এম সাইফুর রহমান’ শীর্ষক এক নীতি সংলাপে অর্থমন্ত্রী এ কথা বলেন। এম সাইফুর রহমান স্মৃতি পরিষদ এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে খেলাপি ঋণে জর্জরিত একটি ব্যাংকের মালিকপক্ষের উদাহরণ টেনে অর্থমন্ত্রী ব্যাংকমালিকদের বিলাসী জীবনযাত্রা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমার কাছে ব্যাংকমালিকদের একটা দল এসেছিল। ২ হাজার কোটি টাকা না হলে ওনাদের ব্যাংক চলবে না। ওনাদের নাকি ৯৬ শতাংশ খেলাপি ঋণ হয়ে গিয়েছিল। এখন উনি আমাকে বলছেন, স্যার, আমরা কিন্তু খেলাপি ৯৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫৬ শতাংশে নিয়ে আসছি। একবার ভাবুন, কেমন মানসিকতা তাদের।’
এ সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি যে দেশের ভেতরে ও বাইরে ব্যাংকের মালিকদের জীবনযাপন কেমন, তা আমরা সব জানি।’
ব্যাংক খাতের টাকা লুটপাটের পেছনে দুর্বল আর্থিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষার বড় দায় আছে বলে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে আর্থিক প্রতিবেদনের মান খুব খারাপ জায়গায় আছে। আর্থিক প্রতিবেদন যথাযথ না হলে পুরো হিসাবের আসল চিত্র ঠিকমতো প্রকাশ পায় না। ব্যাংকগুলো থেকে অর্থায়নের টাকাপয়সা যে লুটপাট হয়েছে, এর জন্য কোনো না কোনোভাবে এই দুর্বল আর্থিক প্রতিবেদনই দায়ী।
অনুষ্ঠানে ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজারের বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে পুঁজিবাজারের গঠনে বড় পরিবর্তন দেখা যাবে। সেখানে কোনো রাজনৈতিক লোক নিয়োগ দেওয়া হবে না, বরং পেশাদার ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে দেশের ব্যাংক খাতের মূলধন–সংকট মেটাতে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাংকগুলোকে যুক্ত করে ব্যাংকিং খাতকে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আরও জানান, বিগত দিনগুলোতে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ৬০ থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকা খরচ হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। তবে বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য বিশাল কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙা করতে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সহায়তার লক্ষ্যে ‘অর্থনীতির গণতান্ত্রিকীকরণ’ স্লোগানকে সামনে রেখে আগামী বাজেটে এর বিশেষ প্রতিফলন থাকবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘কোনো গোষ্ঠীকে বাইরে রেখে অর্থনীতিকে সামনের দিকে এগানো যাবে না।’
নিত্যপ্রয়োজনীয় বেশ কিছু পণ্যের ‘স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ’ বা কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা হবে বলে অনুষ্ঠানে জানান বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, হঠাৎ কোনো কারণে বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটলে তার সরাসরি ধাক্কা বা অভিঘাত যেন দেশের ভোক্তাশ্রেণির ওপর না পড়ে সেটি নিশ্চিত করা।
খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, বিপুল জনসংখ্যার দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে কোনো স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ নেই। এটি সম্ভবত পৃথিবীর বুকে একটি বিরল ঘটনা। এর ফলে দেশের বাজারব্যবস্থার ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল। মাত্র ১৫-২০ দিনের সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হলেই দেশের বাজার তা সহ্য করতে পারে না।
নিত্যপণ্যের দাম কমবে কি না, অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে এ প্রশ্ন করেন উপস্থিত একজন। জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, যেসব জিনিসে আমাদের আমদানিনির্ভরতা আছে, যেসব ব্যবসায় খুব সহজে সবার পক্ষে ঢোকা সম্ভব না। কারণ, এক জাহাজ ডাল, এক জাহাজ সয়াবিন বা তেল আনতে কয়েক শ কোটি টাকা লাগে।
এই সংকট মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতির কথা জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আগামী দিনে প্রতিটি জরুরি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় আমদানি পণ্যের জন্য মজুত ব্যবস্থা তৈরি করতে যাচ্ছেন। সরকারের হাতে যেন পর্যাপ্ত মজুত থাকে এবং ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের মাধ্যমে বাজারে সরকারের হস্তক্ষেপ করার সক্ষমতা তৈরি হয়। এর ফলে আর কোনো কৃত্রিম সংকটের শিকার হতে হবে না।
অতীতে পর্যাপ্ত মজুত না থাকার খেসারত দিতে হয়েছে উল্লেখ করে খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক জটিলতার কারণে আমাদের অনেক বাড়তি দামে এলএনজি, ডিজেল ও সার কিনতে হয়েছে। এই প্রতিটি জিনিসের যদি আমাদের পর্যাপ্ত মজুত সক্ষমতা থাকত, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কাছে এভাবে আমাদের নতি স্বীকার করতে হতো না।’
বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহারের ঘোষণা দিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে চুক্তি সইয়ের দিন থেকে শুরু করে ঋণপত্র, শিপমেন্ট ও দেশে এনে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছানোর পুরো সরবরাহ চেইনকে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলের আওতায় আনা হচ্ছে। এই ডিজিটাল মডেলের মাধ্যমে পণ্যের সার্বিক সরবরাহ ও গতিবিধি সম্পূর্ণ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
এ ছাড়া দেশে জিনিসপত্রের দাম বেশি হওয়ার পেছনে উচ্চ পরিবহন ও আনুষঙ্গিক খরচকে একটি বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশে লজিস্টিক খরচ জিডিপির প্রায় ১৬ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক মানদণ্ড হচ্ছে ১০ শতাংশ। এই খরচ কমিয়ে আনার জন্য বেশ কিছু খাত চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সেখানে বড় ধরনের সংস্কার করা হবে।
কৃষি পণ্যের হাতবদল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে দামের অস্বাভাবিক তারতম্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, যশোরে যে কৃষক সবজি উৎপাদন করছেন, তিনি হয়তো দাম পাচ্ছেন ১০ বা ১২ টাকা। কিন্তু সেই পণ্যই যখন ঢাকার কারওয়ান বাজারে এসে পৌঁছায়, তখন তার দাম হয়ে যাচ্ছে ৫২ থেকে ৬৪ টাকা। মাঝখানের এই যে অস্বাভাবিক দামের তারতম্য এবং যেসব হাতবদলের কারণে এটি ঘটছে, সেই জায়গাগুলো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই ব্যবধান কমিয়ে এনে উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়ের স্বার্থ রক্ষায় সরকার দ্রুত কয়েকটি অনুসন্ধানী মিশন পরিচালনা করবে বলে জানান তিনি।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.