বিদ্যুতের দাম নতুন করে না বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন দেশের ইস্পাত খাতের ব্যবসায়ীরা। তাদের ভাষ্য, গত কয়েক বছরে গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের দাম বেড়ে যাওয়া, উচ্চ সুদহার ও নির্মাণ খাতে স্থবিরতার কারণে ইস্পাত শিল্প বর্তমানে সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। এই অবস্থায় আবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে অনেক কারখানা উৎপাদন কমাতে বা বন্ধ করতে বাধ্য হবে।
মঙ্গলবার (১৯ মে) রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) মিলনায়তনে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নেতারা এসব কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিএসএমএর সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। এসময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ মাসাদুল আলম, মহাসচিব সুমন চৌধুরী এবং সহসভাপতি মো. রেজাউল করিম প্রমুখ।
সংবাদ সম্মেলনে বিএসএমএর সভাপতি বলেন, “করোনাভাইরাস মহামারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ–পরবর্তী বৈশ্বিক জ্বালানি ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, ডলার সংকট, বিনিময় হারের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত দেশের শিল্প খাতকে চাপে ফেলেছে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি নির্মাণকাজ কমে যাওয়ায় ইস্পাতের চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।”
তিনি বলেন, “বর্তমানে উচ্চ ব্যাংক সুদহার, ঋণ সুবিধার সীমাবদ্ধতা, গ্যাস সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং কার্যকরী মূলধনের সংকট শিল্পকারখানার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। এর মধ্যে আবার বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করা হলে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের শিল্প খাত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।”
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম দাবি করেন, “গত কয়েক বছরে শিল্প খাতে বিদ্যুতের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অপরদিকে কিছু ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম প্রায় ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।” তিনি বলেন, “ইস্পাত খাতের বড় কারখানাগুলো সরাসরি জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ গ্রহণ করে। ফলে এই খাতে সিস্টেম লস, ট্রান্সমিশন লস কিংবা ডিস্ট্রিবিউশন লসের কোনও সুযোগ নেই। তারপরও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ডিমান্ড চার্জ, অতিরিক্ত ভ্যাট এবং পাওয়ার ফ্যাক্টর–সংক্রান্ত জরিমানার মতো বিভিন্ন অযৌক্তিক চার্জ আরোপ করা হচ্ছে, যা কার্যত বিদ্যুতের মূল্য আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।”
সংগঠনটির পক্ষ থেকে ইস্পাত শিল্পের জন্য বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি না করার পাশাপাশি অযৌক্তিক ডিমান্ড চার্জ ও অতিরিক্ত ভ্যাট কমানোর দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে পাওয়ার ফ্যাক্টরভিত্তিক অতিরিক্ত চার্জের নীতি পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানানো হয়। নেতারা বলেন, শিল্পায়ন ও বিনিয়োগবান্ধব জ্বালানি নীতি নিশ্চিত করতে হলে শিল্পকারখানার জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বর্তমানে দেশে ইস্পাত খাতে ৩৫টি কারখানা উৎপাদনে রয়েছে। এসব কারখানার সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টন। স্বাভাবিক সময়ে দেশে ইস্পাতের চাহিদা ৭০ থেকে ৭৫ লাখ টন থাকলেও বর্তমানে তা কমে ৪০ থেকে ৪৫ লাখ টনে নেমে এসেছে। ফলে কারখানাগুলো এখন উৎপাদন সক্ষমতার ৪০ শতাংশেরও কম ব্যবহারের অবস্থায় রয়েছে।
বিএসএমএর মহাসচিব সুমন চৌধুরী বলেন, “বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়ে পরশু গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে ইস্পাত শিল্পের জন্য আলাদা বিদ্যুৎ-মূল্য নির্ধারণের দাবি জানানো হবে।” তিনি বলেন, “ইস্পাতের দাম বাড়লে শুধু শিল্প খাত নয়, সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয়ও বাড়বে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের বাড়ি নির্মাণের খরচও বেড়ে যাবে।”
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.