যুদ্ধের উত্তেজনায় বিশ্ববাজারে আবারও বাড়ল তেলের দাম

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে বিশ্ববাজারে আবারও তেলের দাম বেড়েছে। যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের জবাবে ইরান যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেটিকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর এই বক্তব্যের পর সোমবার সকালে এশিয়ার বাজারে তেলের দামে নতুন করে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে।

ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, পাকিস্তানের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে নিজেদের জবাব পাঠিয়েছে তেহরান। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের মাধ্যমে পাঠানো ওই বার্তায় ইরান অবিলম্বে সংঘাত বন্ধ এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আর কোনো হামলা না হওয়ার নিশ্চয়তা দাবি করেছে। এ তথ্য জানিয়েছে গণমাধ্যম বিবিসি।

তবে ইরানের এই জবাব ট্রাম্পের পছন্দ হয়নি। এর পরই আজ সকালে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ দশমিক ২০ ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ৪ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৯৯ দশমিক ৩০ ডলার।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রয়েছে। এতে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই জ্বালানির দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।

ইরানের শর্তের জবাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ইরানের তথাকথিত প্রতিনিধিদের পাঠানো জবাব আমি এখনই পড়লাম। বিষয়টি আমার পছন্দ হয়নি—সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।’

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের প্রস্তাবের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচল পুনরায় চালু করা এবং ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম স্থগিত রাখার বিষয় ছিল। একইসঙ্গে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ‘নিষ্ক্রিয়’ না করা পর্যন্ত যুদ্ধ শেষ হবে না।

এপ্রিলের শুরুতে শান্তি আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। মাঝেমধ্যে গোলাগুলি হলেও তা মোটামুটি মেনে চলছে তিন পক্ষ। পরে ইরানকে ‘সমন্বিত প্রস্তাব’ দেওয়ার সময় দিতে ২১ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়ে দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

সংঘাত শুরুর পর থেকেই জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা চলছে। ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর আবারও ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়।

বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার জবাবে ওই পথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলার হুমকি দেওয়ার পর কার্যত প্রণালিটি বন্ধ হয়ে যায়।

তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ফলে বিশ্বের বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলোর মুনাফাও বেড়েছে।

গতকাল রোববার সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান আরামকো জানিয়েছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে তাদের আয় ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

আরামকোর প্রধান আমিন নাসের বলেন, দেশজুড়ে বিস্তৃত পাইপলাইন নেটওয়ার্ক তাদের জন্য ‘গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহধমনি’ হিসেবে কাজ করেছে। ফলে ইরান যুদ্ধের কারণে জাহাজ চলাচলে যে বিঘ্ন তৈরি হয়েছে, তা অনেকটাই এড়াতে পেরেছে প্রতিষ্ঠানটি।

গত মাসে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম জানিয়েছে, বছরের প্রথম তিন মাসে তাদের মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। গত সপ্তাহে আরেক তেল কোম্পানি শেলও আয় বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি সুবিধা

মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র এখন বড় ধরনের সুবিধা পাচ্ছে। এই যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে তেলের নিট রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। অথচ ২০১৪ সালের আগে পর্যন্ত দেশটি কার্যত কোনো তেল রপ্তানি করত না। এ তথ্য জানিয়েছে গণমাধ্যম এল পাইস।
অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি পরিশোধিত জ্বালানি যুক্ত করলে যুক্তরাষ্ট্রের মোট রপ্তানি এখন দৈনিক ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে। বিশেষ করে ইউরোপে ডিজেল রপ্তানি বেড়ে যাওয়ায় এই উল্লম্ফন ঘটেছে।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.