ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ফরেক্স ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে পাচার হওয়া প্রায় ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ফিরিয়ে এনেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। যা বর্তমান বাজার দরে প্রায় ৪৪ কোটি ১৪ লাখ ৬২ হাজার ৩০৩ টাকা। উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে অনলাইনভিত্তিক প্রতারণামূলক বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম ‘মেটাভার্স ফরেইন এক্সচেঞ্জে’র (এমটিএফই) মাধ্যমে এই টাকা পাচার করা হয়।
সোমবার (৩০ মার্চ) বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
গত ২০২৩ সালের আগস্টে ‘MTFE Ponzi Scheme’-এর প্রতারণার শিকার হয়ে এক ভুক্তভোগী খিলগাঁও থানায় মামলা করেন। তিনি এজাহারে উল্লেখ করেন, ‘Metaverse Foreign Exchange (MTFE)’ নামের একটি বিনিয়োগ অ্যাপে প্রায় দুই লাখ টাকা বিনিয়োগ করে প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
তবে সিআইডির তদন্তে দেখা যায়, এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অসংখ্য বিনিয়োগকারী কোটি কোটি টাকা হারিয়েছেন এবং প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এমটিএফই একটি কথিত ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ফরেক্স ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম, যা ২০২২ সালের জুন থেকে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুক ও ইউটিউবে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে দ্রুত মুনাফার প্রলোভন দেখানো হয়।
ব্যবহারকারীদের একটি ভার্চুয়াল ট্রেডিং অ্যাকাউন্ট দেওয়া হতো, যেখানে জমা অর্থ ডিজিটাল ডলার হিসেবে প্রদর্শিত হতো। তবে এই ট্রেডিং কার্যক্রম ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া। কৃত্রিমভাবে লাভ-ক্ষতির তথ্য দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করা হতো। প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু অর্থ ফেরত দিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করা হলেও ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ করেই প্ল্যাটফর্মটি কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্টে প্রদর্শিত ভার্চুয়াল মুদ্রা ছিল সম্পূর্ণ কাল্পনিক। বিপরীতে বিনিয়োগকারীদের প্রকৃত অর্থ বিভিন্ন ক্রিপ্টো ওয়ালেটে স্থানান্তর করে বিদেশে পাচার করা হয়।
তদন্তে জানা যায়, প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া অর্থের একটি অংশ প্রায় ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ইউএসডিটি (Tether) আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ OKX-এ সংরক্ষিত রয়েছে। ব্লকচেইন বিশ্লেষণ টুল ‘Chainalysis Reactor’ ব্যবহার করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে অর্থটি এমটিএফই প্রতারণা চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। পরে OKX-এর লিগ্যাল টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা আইনগত প্রক্রিয়ায় অর্থ ফেরত দিতে সম্মত হয়।
সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) উদ্যোগে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু হয়। আদালতের অনুমোদন নিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক পিএলসি, মালিবাগ শাখায় ‘CID, Bangladesh Police’ নামে একটি সরকারি হিসাব খোলা হয়। একই সঙ্গে পাচারকৃত ক্রিপ্টোকারেন্সি বৈধ মুদ্রায় রূপান্তরের লক্ষ্যে যুক্তরাজ্যভিত্তিক অ্যাসেট রিয়েলিটি লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করে সিআইডি। নির্ধারিত প্রক্রিয়া শেষে ৩৬ লাখ ২২ হাজার ৯৯৮ মার্কিন ডলার সোনালী ব্যাংকের সরকারি হিসাবে জমা হয়, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৪ কোটি ১৪ লাখ ৬২ হাজার ৩০৩ টাকা।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিভিন্ন সংস্থা ও বাংলাদেশ-মার্কিন কূটনৈতিক সহযোগিতায় মামলার তিন বছরেরও কম সময়ে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থের এই অংশ উদ্ধার সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার। ভুক্তভোগীদের শনাক্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল এবং আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাচার হওয়া বাকি অর্থ শনাক্ত ও উদ্ধারে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.