হুতিদের যুদ্ধে সম্পৃক্ততা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত

ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধে প্রথম চার সপ্তাহ হুতিরা হামলা চালায়নি, যদিও তাদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। শেষমেশ তারা এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মূলত ইয়েমেনের উপকূলীয় এলাকায় হুতিদের অবস্থান। ২০২৩ সালে হামাসকে সমর্থন জানাতে তারা লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে ইয়েমেন ও হর্ন অব আফ্রিকার মাঝামাঝি বাব আল-মান্দাব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলা চালায় বলে গণমাধ্যম জানিয়েছে।

ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথ ঝুঁকির মুখে পড়ে। একই ধরনের হামলা আবার শুরু হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধাক্কা খাবে। এর সঙ্গে যদি ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তাহলে বিশ্ববাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের দুটি প্রধান কৌশলগত জলপথ কার্যত অচল হয়ে পড়বে।

২১ মার্চ ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির এক সামরিক কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেন, খারগ দ্বীপে তেল স্থাপনায় মার্কিন আগ্রাসন হলে তেহরান লোহিত সাগর ও ইয়েমেনের পশ্চিমে অবস্থিত বাব আল-মান্দাব প্রণালি অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব

ইসরায়েলের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে হুতিরা সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। এতে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তারা লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজে আবার হামলা শুরু করতে পারে। এমন হলে সামুদ্রিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক অর্থনীতি আরও বড় সংকটে পড়বে বলে গণমাধ্যম জানিয়েছে।

হুতিরা জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে লোহিত সাগর ব্যবহার করতে দেবে না। শুক্রবার এক বিবৃতিতে হুতি সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি বলেন, “আমাদের আঙুল ট্রিগারের ওপর।”

বিশ্লেষকেরা বলছেন, হুতিদের এ ধরনের হামলায় শুধু তেলের দাম বাড়বে না, বরং পুরো সামুদ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। এর প্রভাব জ্বালানি বাজার ছাড়িয়ে অন্যান্য খাতেও পড়বে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরব প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তের বাব আল-মান্দাব প্রণালি দিয়ে পরিবহন করছে।

৩২ কিলোমিটার চওড়া এই প্রণালি বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের অন্যতম ব্যস্ত পথ। বিশ্বের মোট কনটেইনার বাণিজ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সুয়েজ খালে যাওয়ার সময় এই পথ অতিক্রম করে। এখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শিপিং কোম্পানিগুলোকে উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে যেতে হয়, এতে ব্যয় অনেক বেড়ে যায়।

বিশ্ববাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ সুয়েজ খাল দিয়ে পরিবাহিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, শস্য এবং বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য। বিশ্লেষকেরা বলছেন, লোহিত সাগরে অস্থিরতা বাড়লে বহু দেশ অর্থনৈতিক চাপে পড়বে।

মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব

লোহিত সাগরের অস্থিরতার কারণে জাহাজগুলোকে বিকল্প পথে চলতে হলে এশিয়া-ইউরোপ রুটে প্রতি যাত্রায় জ্বালানি খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে, পাশাপাশি বিমা ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। ফলে সামগ্রিক পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব অনুযায়ী, কোভিড-১৯ মহামারির সময় মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির একটি উল্লেখযোগ্য কারণ ছিল পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি। সাধারণ সময়ে আমদানি খরচের একটি অংশ পরিবহন ব্যয় হলেও সংকটকালে তা বহুগুণ বেড়ে যায়।

তবে বিশ্লেষকেরা মনে করেন, পরিবহন ব্যয় বাড়লেও এর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে মূল্যস্ফীতিতে পড়ে না; সাধারণত সময় লাগে। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী না হলে সামগ্রিক প্রভাব সীমিত থাকতে পারে।

ইউরোপের গ্যাস সরবরাহ ঝুঁকিতে

লোহিত সাগরে হামলা বাড়লে ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শীতকালীন প্রয়োজন মেটাতে ইউরোপ আমদানিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বহনকারী ট্যাংকারগুলো নিয়মিত এই পথ ব্যবহার করে।

২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত হুতিরা ১০০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এতে দুটি জাহাজ ডুবে যায় এবং চারজন নাবিক নিহত হন। একই সময়ে তারা ইসরায়েলের দিকেও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে।

এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইয়েমেনে হুতি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বিমান হামলা চালায়। এতে বহু মানুষ নিহত হন। পরে হুতিরা লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা বন্ধে সম্মত হলে যুক্তরাষ্ট্র হামলা স্থগিত করে।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.