বিনিয়োগ বাদ দিয়ে ভোগ নির্ভর অর্থনীতি কখনো টেকশই হতে পারেনা: রাশেদ আল মাহমুদ

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, বিনিয়োগের উপর নির্ভরতা কমিয়ে ভোগ নির্ভর কিংবা ঋণ নির্ভর অর্থনীতি কখনো টেকশই হতে পারেনা। বিনিয়োগ নির্ভর না হলে অর্থনীতি টেকশই হয়না।

রবিবার (০৮ মার্চ) রাজধানীর একটি হোটেলে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্ট ফোরাম আয়োজিত, ‘পুঁজিবাজারে নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ পথ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

রাশেদ আল মাহমুদ বলেন, আমরা একটি ঋণ নির্ভর সমাজ থেকে মালিকানা নির্ভর সমাজে রূপান্তরিত হতে চাই। যেখানে সকল জনগন মালিক হিসেবে রোল করবে। জনগণের এবং দেশের সকল সেবা সুবিধার মালিক জনগণেনর নিজের থাকবে। অর্থনৈতিক গণতন্ত্রী করণের একমাত্র পথ হচ্ছে পুঁজিবাজার।

তিনি বলেন, পুঁজিবাজারের অসুখগুলো চিন্হিত। বাজার ভিত্তিক অভ্যন্তরীণ রেগুলেটরি ব্যবস্থা খুব খারাপ। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় ঘাটতি বাজারের মাঝে থাকা অডিট, ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি, এডভেকেসির মতো রেগুলেটরগুলো।তাই বাজার ঠিক করতে হলে এসব প্রতিষ্ঠান যদি ঠিকমতো দায়িত্ব পালন না করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে পারলে বাজারে মানুষের আস্থা ফিরে আসবে। বাংলাদেশে ইসলামিক স্টক এক্সচেঞ্জ হোক। মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার মতো করে কিছু চিন্তা করা।

সবশেষে ইসলামিক ফাইন্যান্সের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশে ইসলামিক স্টক এক্সচেঞ্জ গড়ে তোলার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে, যাতে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর বিনিয়োগকারীরা এখানে লেনদেন করতে পারেন।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বলেন, আমরা খুব অল্প সময়ের মাঝে অনেকগুলো রুলসের সংশোধন এনেছি। ২০০ তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। ১৫০০ কোটি টাকা জরিমানা করেছি। যার মাঝে ৫ কোটি ২০ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে। এর মাঝে দুদকে অভিযোগ পাঠানো হয়েছে ১৬ টি এবং ৪ টি মামলা চলমান।

তিনি বলেন, বড় কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনার জন্য আমরা একটি ল’ ড্রাফট করেছি। যা প্রয়োগ করতে সরকার এবং অন্যান্য সহোযোগি সংগঠনগুলোর সহযোগিতা আমাদের লাগবে। বাজার সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রধান উপাদান ভালো কোম্পানি বাজারে আনা। বাংলাদেশে অনেক ভালো কোম্পানি আছে কিন্তু আমাদের বাজারে তালিকাভুক্ত নেই৷

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রহমান খান বলেন, পুঁজিবাজারে ইনসেনটিভের কথা যদি বলি আমরা এটা অতীতে অনেক দিয়েছি। কিন্তু তা ফলপ্রসূ হয়নি।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দেশের সর্বস্তরের জনগণের কথা চিন্তা করে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মতো বিষয়গুলো হাতে নিয়েছে। এসবের জন্য এনবিআরকে রেভিনিউ জেনারেট করতে হবে। এই মুহুর্তে এনবিআরের কাছে বড় বড় ইনসেনটিভ গুলো চাওয়ার আগে আপনারা চিন্তাভাবনা করবেন।

আব্দুর রহমান খান বলেন, পৃথিবীর কোন দেশ পুজিবাজারকে শক্তিশালী না করে শিল্প বিপ্লব ঘটাতে পারেনি। তাই পুঁজিবাজার নিয়ে দেশের মানুষ এবং কিছু পলিসি মেকারের নেতিবাচক ধারণা পরিবর্তন করার জন্য আমাদের কাজ করতে হবে। বিএসইসি ইতিমধ্যে অনেকগুলো সংস্কার এনেছে যা কার্যকরী। রেভিনিউ লিকেজ তৈরি না করে বাজার এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আপনাদের পাশে যতোট থাকা যায় এনবিআর থাকবে।

বিএসইসি কমিশনার সাইফুদ্দিন সিএফএ বলেন, সকল স্টেক হোল্ডার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার একসাথে বসে আমাদের এড্রেস করা সমস্যাগুলল সমাধান করলেই বাজার এগিয়ে যাবে। মেক্রো এবং সিস্টেমিক ডিজএলাইমেন্ট গুলো সনাক্ত করে সমাধান করতে পারলেই আমরা সামনের দিলে এগিয়ে যেতে পারবো।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, পুজিবাজারের গোড়ার সমস্যা হলো বিগত সরকার বাজারকে গুরুত্ব দেয়নি। সরকারের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় পুজিবাজার যায়গা পায়নি।

তিনি বলেন, তবে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে পুঁজিবাজার ছিলো। সরকারে তহবিলে পুজিবাজার হতে পারে সোর্স অফ ফান্ড। সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোকে লিস্টেড করা যেতে পারে। আমরা যদি সবাই মিলে একসাথে কাজ করতে পারি, তবে আশা করি আগামী ৫ বছরের মাঝে পুজিবাজার আমাদের অর্থনীতির জন্য আস্থাশীল রুট তৈরি করবে।

সিএসইর চেয়ারম্যান একেএম হাবিবুর রহমান বলেন, অর্থনীতির সাথে আমাদের পুঁজিবাজার ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শক্তিশালী পুঁজিবাজারের জন্য তিনটি বিষয় প্রয়োজন। এক- একটি স্থিতিশীল, স্বাস্থ্যকর ব্যাংকিং ব্যবস্থা, স্থিতিশীল অর্থনীতি ও আইনের শাসন দরকার।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ সভাপতি রিয়াদ মাহমুদ বলেন, পুঁজিবাজারের সর্বস্তরে ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করা খুবই দরকার। যাতে আমরা স্টেটমেন্ট বা ডকুমেন্টগুলো ডিজিটালি সাবমিট করতে পারি। তিনি অতিরিক্ত লিস্টিং ফি আইপিও আসার ক্ষেত্রে বড় একটি বাধা। অনেকে মনে করেন ৩০ লাখ টাকা খরচ করে যদি বাজারে আসার অনুমতি না পাই তবে এই অর্থ বৃথা।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন সাধারণ সম্পাদক সুমিত পোদ্দার বলেন, গত দুই বছর ধরে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে আসেনি। এখন আইপিওর মৌসুম। ইনসেনটিভ দিয়ে হলেও ভালো কিছু কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনা দরকার। বেশি নয়, অল্প কিছু কোম্পানি বাজারে আসুক, কিন্তু সেগুলো ভালো হোক।

ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্ট ফোরামের (সিএমজেএফ) সভাপতি মনির হোসেন বলেন, সেমিনারে মূল উদ্দেশ্য হলো মূল চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরা। বিনিয়োগকারীদের চাহিদা হচ্ছে আস্থা ফিরিয়ে আনা ও ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্ত করা। একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে বিনিয়োগকারীদের এসব বিষয়ে কমিটমেন্ট থাকতে হয়। আমরা এ সরকারের কাছে সেটাই প্রত্যাশা করছি।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.