ভারতের সুপ্রিম কোর্ট গতকাল মঙ্গলবার বিভিন্ন বামপন্থী দলের নেতাদের একটি আবেদন তালিকাভুক্ত করার বিষয় বিবেচনা করতে সম্মত হয়েছে। ওই আবেদনে আসামের বিজেপিদলীয় উগ্রপন্থী মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
সম্প্রতি ভাইরাল একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, তিনি রাইফেল তাক করে গোলটুপি পরিহিত ব্যক্তিদের ছবি লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছেন। ওই ব্যক্তিদের মুসলিম বলে অভিযোগ করে বিরোধীরা একযোগে বলেছে, এই ভিডিও ‘জাতিগত নিধনের’ একধরনের প্রস্তুতি।
ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও এন ভি আঞ্জারিয়ার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ বিষয়টি নিয়ে দুটি বামপন্থী দল কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (সিপিআই) এবং কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া মার্ক্সবাদী (সিপিআইএম) তাদের বক্তব্য শুনতে সুপ্রিম কোর্টের কাছে আবেদন জানায়। দুই রাজনৈতিক দলের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টে আবেদনটি পেশ করেন আইনজীবী নিজাম পাশা।
আদালতে পাশা বলেন, ‘আমরা আসামের মুখ্যমন্ত্রীর বিরক্তিকর বক্তব্যের বিষয়ে এই আদালতের জরুরি হস্তক্ষেপ চাইছি। সম্প্রতি একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে যেখানে দেখা যাচ্ছে, তিনি একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের সদস্যদের ছবি নিশানা করে গুলি ছুড়ছেন। অভিযোগ দায়ের করা হলেও এখনো কোনো এফআইআর নথিভুক্ত করা হয়নি।’
জবাবে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘সমস্যা হলো, নির্বাচন আসার সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচনের একটি অংশের লড়াই হয় সুপ্রিম কোর্টে। এটাই সমস্যা। আমরা বিষয়টি দেখব এবং একটি তারিখ দেব।’
অর্থাৎ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বামপন্থী দলগুলোর বক্তব্য শুনতে সম্মত হয়েছেন ভারতের সর্বোচ্চ আদালত। তবে বিরোধীদের একাংশ মনে করেন, আসামের মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের বিরুদ্ধে স্বতপ্রণোদিতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল সুপ্রিম কোর্টের, যা তাঁরা নেননি।
৭ ফেব্রুয়ারি আসাম বিজেপির অফিশিয়াল ‘এক্স’ অ্যাকাউন্ট থেকে একটি ভিডিও শেয়ার করা হয়েছিল। সেখানে দেখা যায়, হিমন্ত বিশ্বশর্মা রাইফেল তাক করে এমন দুজনের দিকে গুলি ছুড়ছেন, যাঁদের মধ্যে একজন টুপি পরা এবং অন্যজনের মুখে দাড়ি রয়েছে।
এই বিতর্কিত পোস্টটি ব্যাপক জনরোষ এবং রাজনৈতিক নিন্দার জন্ম দেয়। অবশ্য এই নিন্দা প্রধানত এসেছে রাজনৈতিক দলগুলোর দিক থেকে। সার্বিকভাবে সমাজের সব অংশের মানুষ এই ভিডিও চিত্রের নিন্দা করেননি। তবে বিষয়টি ভারতের সংবাদপত্রে এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।
সহিংসতা ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার অভিযোগ ওঠার পর বিজেপি পোস্টটি মুছে ফেলে। এই বিষয়টি নিয়েই আদালতে তাদের বক্তব্য তুলে ধরার জন্য আবেদন করে সিপিআই ও সিপিআইএম।
পাশাপাশি হিন্দুত্ববাদী মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা কংগ্রেসের তিন জ্যেষ্ঠ নেতা জিতেন্দ্র সিং, ভূপেশ বাঘেল এবং আসামের গৌরব গগৈয়ের বিরুদ্ধে ৫০০ কোটি রুপির মানহানির মামলা করেছেন। আসামে জমি দুর্নীতি–সংক্রান্ত বিষয়ে ‘মিথ্যা’ এবং ‘বিদ্বেষমূলক’ অভিযোগ তোলার পরিপ্রেক্ষিতে হিমন্তের এই আইনি পদক্ষেপ।
গতকাল দায়ের করা এই মামলা এমন এক সময়ে এল, যখন চলতি অর্থনৈতিক বছরের শেষের দিকে বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে।
গত সপ্তাহে আসাম কংগ্রেসের সভাপতি গৌরব গগৈ দাবি করেছিলেন, দলীয় তদন্তে দেখা গেছে আসামজুড়ে হিমন্ত বিশ্বশর্মা এবং তাঁর পরিবারের দখলে প্রায় ১২ হাজার বিঘা জমি রয়েছে। এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই মুখ্যমন্ত্রী মানহানির মামলা করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। তিনি দাবি করেন, এই অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।
বিশ্বশর্মা তাঁর ‘এক্স’ অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, ‘আমার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে মিথ্যা, বিদ্বেষমূলক এবং মানহানিকর অভিযোগ করায় আমি কংগ্রেস নেতা জিতেন্দ্র সিং, ভূপেশ বাঘেল ও গৌরব গগৈয়ের বিরুদ্ধে ৫০০ কোটি রুপির ক্ষতিপূরণ দাবি করে মানহানির মামলা করেছি।’
এর আগে বিতর্কিত বক্তব্য দেওয়া এই মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, তিনি ‘গান্ধী পরিবারের দাসদের’ অপপ্রচার, কুৎসা বা রাজনৈতিক নাটকে ‘ভয়’ পাবেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি আরও লিখেছিলেন, ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন রাজনীতির দিন শেষ। তাদের যদি সামান্যতম সাহস বা প্রমাণ থাকে, তবে আদালতের সামনে প্রতিটি অভিযোগ প্রমাণ করুক।’
হিমন্ত বনাম গৌরবের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব
এই মানহানির মামলা হিমন্ত বিশ্বশর্মা ও আসামের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈয়ের ছেলে গৌরব গগৈয়ের মধ্যে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সম্প্রতি আসামের মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, গৌরব গগৈ এবং তাঁর ব্রিটিশ স্ত্রী এলিজাবেথ কোলবার্নের সঙ্গে পাকিস্তানি নাগরিক আলি তৌকির শেখের ‘গভীর যোগাযোগ’ রয়েছে। তাঁর মাধ্যমে তথ্য পাকিস্তানে পাচার হয়ে থাকতে পারে।
কংগ্রেস দ্রুত এর পাল্টা জবাব দিয়ে বলেছে, হিমন্তের এই দাবির স্বপক্ষে কোনো বস্তুগত তথ্যপ্রমাণ নেই এবং রাজনৈতিক চাপে তিনি ‘মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন।’ তবে বিষয়টি আসামে নির্বাচনের প্রাক্কালে ইস্যু হিসেবে ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.