বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম জাতীয় নির্বাচনে অনেকগুলো রাজনৈতিক দল অংশ নেবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেশে কার্যত একটা দ্বিদলীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এ কারণে অনেক সময় পরিবেশবান্ধব ও ভালো প্রতিশ্রুতি দেওয়া প্রার্থীরা যথেষ্ট নাগরিক সমর্থন পান না। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়া হলে সেই নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে না।
শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইনে আয়োজিত এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। ‘নির্বাচনী এলাকায় সবুজ টেকসই অর্থনীতির চালচিত্র ও প্রত্যাশা: প্রার্থী ও ভোটার জরিপের ফলাফল’ প্রকাশ উপলক্ষে এ ব্রিফিং আয়োজন করে সিপিডি। এতে সহযোগিতা করে তারা ক্লাইমেট ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।
মিডিয়া ব্রিফিংয়ে জরিপের তথ্য উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। উপস্থিত ছিলেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত, অনুষ্ঠান সহযোগী সামি মোহাম্মদ, মালিহা সাবাহ ও নূর ইয়ানা জান্নাত এবং তারা ক্লাইমেট ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের কর্মসূচি পরিচালক শওকত আরা।
অনুষ্ঠানে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দ্বিদলীয় নির্বাচনকাঠামোয় নাগরিকদের বহুমাত্রিক প্রত্যাশা অনেক সময় প্রার্থীদের নির্বাচনী লক্ষ্য ও কর্মসূচিতে প্রতিফলিত হয় না। ফলে ভোটারদের মধ্যে সুবিধাবাদী প্রবণতা তৈরি হয়। যে প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা বেশি, ভোটাররা তাকেই ভোট দেন। এতে পরিবেশবান্ধব বা এলাকার জন্য ইতিবাচক কাজ করা প্রার্থীরা পিছিয়ে পড়েন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের সমর্থক ও ভোটাররা চূড়ান্ত নির্বাচনী ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। এই বড় জনগোষ্ঠীর মতামত ও অংশগ্রহণ উপেক্ষা করা হলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। ‘একটি বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে সব প্রধান রাজনৈতিক পক্ষ ও তাদের ভোটারদের অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।’
পরিবেশদূষণের মূল কারণ এড়িয়ে যাচ্ছে আলোচনা
সিপিডির জরিপে বায়ুদূষণ, অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও স্বাস্থ্যঝুঁকিকে ভোটাররা সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তবে এসব সমস্যার মূল কারণ ও কাঠামোগত সমাধান নিয়ে ভোটার ও প্রার্থীরা আলোচনা এড়িয়ে গেছেন বলে জানান সিপিডির গবেষকেরা।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জরিপে অংশগ্রহণকারীরা গাছ লাগানো বা প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণের মতো প্রচলিত সমাধানের কথা বলেছেন। কিন্তু শিল্পবর্জ্য, ইটভাটা, রাসায়নিক কারখানা কিংবা অবৈধ শিল্পের মতো বায়ুদূষণের প্রকৃত উৎস নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি উঠে আসেনি। এতে বোঝা যায়, মানুষ হয় এসব জানেন না, নয়তো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কারণে কথা বলতে ভয় পান।
তিনি বলেন, পরিবেশ রক্ষা ও পুনরুদ্ধারের জন্য নদী ভরাট, অবৈধ বালু উত্তোলন, পাথর চুরি ও অবৈধ শিল্পকারখানা বন্ধ করা জরুরি। কিন্তু এলাকাভিত্তিক কর্মসংস্থানের নামে ইটভাটা, বালু উত্তোলন বা রিয়েল এস্টেটভিত্তিক কাজকে উন্নয়ন হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা ত্রুটিপূর্ণ। এসব ইস্যু রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হওয়ায় নির্বাচনী ইশতেহার ও প্রচারণায় প্রার্থীরা তা এড়িয়ে যাচ্ছেন।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দেশে এমপিনির্ভর উন্নয়নকাঠামো কার্যকর হবে না। জরিপে দেখা গেছে, ভোটাররা এমপিকে নীতি নির্ধারণ ও প্রকল্প অনুমোদনের জায়গায় দেখতে চান। আর দৈনন্দিন স্থানীয় সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব স্থানীয় সরকারের ওপর ন্যস্ত করতে চান। তাই স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
ইশতেহারে অর্থায়নের স্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই
রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার প্রসঙ্গে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইশতেহারকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা বেড়েছে, যা ইতিবাচক। তবে প্রায় সব দলই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ঘোষণা করলেও সেগুলো বাস্তবায়নের অর্থায়ন কাঠামো স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে পূর্ববর্তী সরকারের ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকার যে ধরনের অর্থায়ন সংকট রেখে যাচ্ছে, তাতে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, পতিত একটি দলের ভোট এবারের নির্বাচনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ফ্যাক্টর’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর ফলে একটি বড় অংশের ভোটার পছন্দ অনুযায়ী ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক ভোটিংয়ের ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিক সংস্কারের স্বার্থে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকারের সময়েও ধারাবাহিকতা রাখা জরুরি। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে চলমান সংস্কার কার্যক্রমে রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিবর্তন না আনার আহ্বান জানান তিনি।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.