গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি ও হয়রানি সিস্টেম্যাটিক (নিয়মতান্ত্রিক) হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে স্বার্থের দ্বন্দ্ব কমাতে হবে।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) সকালে রাজধানী ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে এক সংলাপে এ কথা বলেন তিনি। ‘অর্থনৈতিক শাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ’ শীর্ষক এ নীতি সংলাপের আয়োজন করে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)।
সংলাপে দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক, গবেষক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, দুর্নীতির মূল উৎপাটন এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গঠনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
সংলাপে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সব মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টাদের রিপোর্ট দেওয়া হবে— কোন কাজ হয়েছে, কোনটি হয়নি। এটি পরবর্তী সরকারের জন্য সহায়ক হবে। আমলাদের বেশি ক্ষমতায়ন হয়েছে। বর্তমানে বিনিয়োগ স্থবির, কর্মসংস্থান কম, ট্যালেন্টেড তরুণরা দেশেই থাকতে চায় না। ওভার-সেন্ট্রালাইজেশন বেড়ে গেছে, বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। ডিসিশন ট্রান্সপারেন্সি নেই, জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি মনে করেন, দেশ মূলত আরএমজি ও রেমিট্যান্সের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, তরুণদের ভবিষ্যতের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশকে আরও দ্রুত সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে হবে। শুধু ভালো সরকার দিয়ে দেশ বদলানো যাবে না, বরং সঠিকভাবে দেশ পরিচালনার জন্য শক্তিশালী নাগরিক সমাজ থাকা জরুরি।
তিনি বলেন, একটি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখার সূচনা হলেও সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে দেশ হোঁচট খাচ্ছে। দুর্নীতি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা, অথচ বর্তমান সরকার টেকসই কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেনি। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে, ফলে সাধারণ মানুষ উপেক্ষিত বোধ করছে।
চলতি বছর বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পথে থাকলেও সে জন্য দেশ কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি আরও বলেন, আর্থিক খাতে কিছু সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলো টেকসই হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। একই সঙ্গে তিনি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া নিয়েও সন্দেহের কথা জানান।
তার মতে, দেশে অগ্রাধিকারভিত্তিক কাজের সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে জনগণ আর প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না। তারা বাস্তব ও দৃশ্যমান কার্যক্রম দেখতে চায়।
সংলাপে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, ভালো মানুষ রাজনীতিতে না এলে সংসদে জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তিনি সংসদ সদস্যদের ফুলটাইম এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং এমপি হোস্টেল ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, দেশে নীতিমালার অভাব নেই, কিন্তু বাস্তবায়নের ঘাটতি প্রকট। শেয়ারবাজার সংস্কার, করছাড়ের যৌক্তিক ব্যবহার এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ট্রেড লাইসেন্স সহজীকরণের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
র্যাপিড-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. এম আবু ইউসুফ বলেন, রাজনীতি থেকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আলাদা করা না গেলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। সরকারি তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে সংযোগহীনতাও তিনি বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন।
ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা বলেন, ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংক ঋণ, কাস্টমস ও কর ব্যবস্থায় ঘুষ ও দুর্নীতির কারণে নতুন উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন বলেও অভিযোগ তোলেন তারা।
ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স খাত প্রসঙ্গে বক্তারা বলেন, এসব খাতে ডিপলিটিসাইজেশন, স্বাধীন রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান এবং আইনি সংস্কার ছাড়া সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী। তিনি বলেন, কোনো সরকারের আমলেই দুর্নীতি কমেনি, বরং প্রতিবারই বেড়েছে। কর-জিডিপি অনুপাত কমে যাওয়া এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ হ্রাস পাওয়াও উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংলাপে বক্তারা একমত পোষণ করেন যে, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও অর্থনৈতিক শাসন নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.