আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে যুক্তরাষ্ট্র দায়মুক্তির সঙ্গে আচরণ করছে এবং দেশটি মনে করে তাদের ক্ষমতা আন্তর্জাতিক আইনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ—এমন মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস।
গণমাধ্যম রেডিও ৪-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অ্যান্তনিও গুতেরেস বলেন, ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি স্পষ্ট বিশ্বাস কাজ করছে যে, বহুপক্ষীয় সমাধান অপ্রাসঙ্গিক। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে, তা হলো মার্কিন ক্ষমতা ও প্রভাবের প্রয়োগ। কখনো কখনো সেই প্রয়োগ আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ডকে পাশ কাটিয়ে করা হচ্ছে।
কয়েক সপ্তাহ আগে ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্টকে আটক এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকির পর ইউরোপে ব্যাপক অস্থিতিশীলতার মাঝে জাতিসংঘ মহাসচিব এসব মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাকালীন নীতিগুলো বর্তমানে হুমকির মুখে রয়েছে, যার মধ্যে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সমতার নীতিও অন্তর্ভুক্ত।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অতীতেও জাতিসংঘের কঠোর সমালোচনা করেছেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি সংস্থাটির অস্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সে সময় তিনি বলেন, তিনি একাই সাতটি কখনোই শেষ না হওয়া যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছেন, যেখানে জাতিসংঘ এর একটি যুদ্ধ অবসানে সহায়তা করার চেষ্টা করেনি। তিনি আরও বলেন, পরে তিনি বুঝতে পারেন, জাতিসংঘ তাদের জন্য সেখানে ছিল না।
এই সমালোচনার প্রেক্ষাপটে অ্যান্তনিও গুতেরেস স্বীকার করেন, জাতিসংঘ সনদের আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে বাধ্য করাতে সংস্থাটি হিমশিম খাচ্ছে। তবে তিনি বলেন, বড় বড় বৈশ্বিক সংঘাত সমাধানে জাতিসংঘ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে, যদিও সংস্থাটির কোনো চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা নেই এবং এই ক্ষমতা মূলত বড় শক্তিগুলোর হাতেই রয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, সেই অতিরিক্ত প্রভাব কি সত্যিকারের ও টেকসই সমাধান আনতে ব্যবহৃত হচ্ছে, নাকি কেবল তাৎক্ষণিক সমাধানে সীমাবদ্ধ থাকছে। এই দুইয়ের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গুতেরেস বলেন, সংস্থাটিতে সংস্কার প্রয়োজন, যাতে ১৯৩টি সদস্য দেশের সামনে থাকা গুরুতর সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যায়। তাঁর মতে, কিছু মানুষ মনে করে আইনের শক্তির জায়গায় ক্ষমতার আইন বসানো উচিত।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়, বহুপাক্ষিক সমাধানকে তারা গুরুত্ব দিচ্ছে না; বরং তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা ও প্রভাবের প্রয়োগ এবং কখনো কখনো তা আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ডের তোয়াক্কা না করেই।
অ্যান্তনিও গুতেরেস বলেন, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য গঠিত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এখন আর বিশ্বকে যথাযথভাবে প্রতিনিধিত্ব করে না এবং এটি অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্য—ফ্রান্স, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র—এর যে কোনো এক সদস্য বর্তমানে প্রস্তাব ভেটো দিতে পারে। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র এই ক্ষমতা ব্যবহার করে ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধ বন্ধের আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা ব্যাহত করেছে।
গুতেরেসের অভিযোগ, ভেটো ক্ষমতা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব স্বার্থ এগিয়ে নিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। তিনি বলেন, নিরাপত্তা পরিষদে তিনটি ইউরোপীয় দেশ স্থায়ী সদস্য হিসেবে রয়েছে। পর্তুগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অ্যান্তনিও গুতেরেস ২০১৭ সালে জাতিসংঘের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং চলতি বছরের শেষে তিনি এই দায়িত্ব ছাড়বেন।
সাধারণ পরিষদে তার বার্ষিক ভাষণে তিনি বিশৃঙ্খল এক বিশ্বের চিত্র তুলে ধরেন এবং বলেন, বর্তমান বিশ্ব সংঘাত, দায়মুক্তি, বৈষম্য ও অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ। বৈশ্বিক ব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক আইনের প্রকাশ্য লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করেন।
চলমান সংঘাতগুলোর মধ্যে গাজাকে জাতিসংঘের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে চিহ্নিত করে গুতেরেস বলেন, যুদ্ধের বড় সময়ে সেখানে সহায়তা বিতরণে জাতিসংঘ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ইসরায়েল আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোকে গাজায় প্রবেশ করতে দেয়নি।
সম্প্রতি তিনি বলেন, ১৯৪৫ সালের সমাধান-পদ্ধতি দিয়ে ২০২৬ সালের সমস্যা সমাধান করা যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ভেনেজুয়েলার নেতৃত্ব পরিবর্তন, ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হাজারো মানুষের মৃত্যু এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের লক্ষ্যের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
বহুপাক্ষিক বিশ্ব ব্যবস্থার মৃত্যু এবং আন্তর্জাতিক আইনের শাসন রক্ষায় কিছু বিশ্বনেতার নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও গুতেরেস বলেন, তিনি আশাবাদী থাকতে চান। তাঁর ভাষায়, শক্তিশালীদের চ্যালেঞ্জ না করলে কখনোই একটি ভালো বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.