শিশু পার্কে পার্টি অফিস-পীরের মাজার!

0
152
park 4-1
খুলানার গোলকমনি শিশুপার্কে এভােই রাখা রাখা হয়েছে সারি সারি ইটের স্তুপ।

খুলনার প্রাণকেন্দ্রে ১৯৯৪ সালে গড়ে ওঠে মহানগরী শিশুপার্ক। পরের বছর জাতিসংঘের ৫০ বছর পূর্তি উৎসব উপলক্ষে এর নামকরণ করা হয় ‘জাতিসংঘ শিশু পার্ক’। অভিযোগ উঠেছে, খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) সেখানে মেলার মাঠ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজও শুরু করেছে। এছাড়া আইন অমান্য করে নগরীর গোলকমনি পার্কটির অংশবিশেষ একটি ঠিকাদারী এজেন্সিকে ভাড়াও দিয়েছে কেসিসি।

park 4-1
খুলানার জাতিসংঘ শিশুপার্কে এভােই রাখা রাখা হয়েছে সারি সারি ইটের স্তুপ।

শুধু তাই নয়, নগরীতে শিশুদের জন্য গড়ে তোলা পার্কগুলো পরণিত হয়েছে অপরাধী চক্র, মাদকাসক্ত, প্রেমিক-প্রেমিকা, ভ্রাম্যমাণ পতিতাদের নিরাপদ আশ্রয়ে। এমনকি ক্লাব, কাউন্সিলর অফিস, দলীয় অফিস, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দখলে চলে গেছে কয়েকটি পার্ক।

যেখানে ২০০০ সালের উদ্যান সংরক্ষণ আইনের ৩৬ (৫) ধারায় বলা হয়েছে, ‘খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান ও প্রাকৃতিক জলাধার হিসাবে চিহ্নিত জায়গার শ্রেণী পরিবর্তন করা যাইবে না বা উক্তরুপ জায়গা অন্য কোনভাবে ব্যবহার করা যাইবে না বা অনুরুপ ব্যবহারের জন্য ভাড়া, ইজারা বা অন্য কোনভাবে হস্তান্তরও করা যাইবেনা’।

কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, নগরীতে কেসিসির মোট ৮টি পার্ক রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে- জাতিসংঘ শিশুপার্ক, হাদিস পার্ক, গোলকমনি শিশু পার্ক, শের-এ-বাংলা রোডস্থ মিনি শিশু পার্ক, সোনাডাঙ্গাস্থ মিনি শিশু পার্ক, নিরালা রোডস্থ শিশু পার্ক,খালিশপুর রোডস্থ শিশু পার্ক ও খুলনা লেডিস পার্ক।

park 5
পার্কে বিনোদনের পরিবেশ না থাকায় কমছে দর্শনার্থীর সংখ্যা। ছবিটি নগরীর জাতিসংঘ শিশু পার্কের।

সরেজমিন দেখা গেছে, পার্কগুলো যেন মাদকাসক্তদের নিরাপদ ঘাঁটি। তারা প্রকাশ্যে সিরিঞ্জ দিয়ে নেশাজাতীয় ইনজেকশন গ্রহণ করে। আর তাদের ভয়ে প্রতিদিন কমছে দর্শনার্থী। এছাড়া অনেক পার্কে সকাল-সন্ধ্যা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আপত্তিকর অবস্থায় দেখা যায়। ফলে পরিবার নিয়ে অবসর কাটানো যায় না সেখানে।

শিশু পার্কে পীরের মাজার!

শিশুদের জন্য নগরীর অন্যতম বিনোদন স্পট জাতিসংঘ শিশুপার্ক। পার্কটির মধ্যে বিভিন্ন ধরনের রাইডারসহ দর্শনার্থীদের বসার স্থান তৈরি করা হলেও বর্তমানে সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে সেগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তারওপর, পার্কটির পূর্বপার্শ্বের জায়গা দিনে দিনে বেদখল হয়ে গড়ে উঠেছে পীরের মাজার, ধর্মীয় উপাসনালয়, বহুতল আরবান হেলথ কেয়ার সেন্টার ও সিটি কর্পোরেশনের পানি উত্তোলনের পাম্প হাউজ।

বছরের বিভিন্ন সময় পার্ক দখল করে বিভিন্ন সংগঠন মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে। এসব অনুষ্ঠানের কারণে পার্কের আমব্রেলা শেড, দোলনা, স্লিপারসহ অধিকাংশ রাইডারই ভেঙে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে পার্কটির জৌলুস ফিরিয়ে আনার পরিবর্তে সেটিকে মেলা আয়োজনের স্থায়ী মাঠ হিসেবে তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করেছে কেসিসি।

জাতিসংঘ পার্কে কথা হয় নগরীর একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহের সাথে। তিনি বলেন, খুলনা দেশের তৃতীয় বৃহত্তম মহানগরী। অথচ এখানে শিশুদের জন্য একটি পার্কও নেই। ব্যাংক কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ বলেন, কয়েক বছর আগেও জাতিসংঘ পার্কে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে বেড়াতে আসতাম। এখন আর তাদেরকে আনা যায় না, তারাও আসতে চায় না।

জাতিসংঘ শিশু পার্কের পাশের ব্যবসায়ী লিটন ইসলাম বলেন, রাতে পার্কটি হয়ে ওঠে মাদক ব্যবসায়ী-মাদকসেবী ও পতিতাদের আস্তানা। ভেতরে গাঁজা, ফেনসিডিল, হেরোইনসহ বিভিন্ন প্রকার মাদকদ্রব্য বিক্রি হয়। এসবের গ্রাহক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী। পুলিশ থাকলেও সেখানে রাতে ‘অসামাজিক কর্মকাণ্ড’ চলে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

শিশু পার্কে দলীয় অফিস!

নগরের আরেকটি গুরত্বপূর্ণ পার্ক গোলকমনি শিশু পার্ক। এই পার্কের জায়গায় ব্রিটিশ আমলে ছিলো পুকুর। গোলকমনি নামের এক ব্যক্তি পানির কষ্ট দূর করতে তৎকালীন মিউনিসিপ্যালটির কাছে ৬৩ শতক আয়তনের পুকুরটি দান করে দেন। গোলকমনির দান করা পুকুর ভরাট করে শিশুদের জন্য পার্ক বানায় কেসিসি। তবে পার্কটিতে শিশুদের জন্য নির্মল পরিবেশ এখন আর নেই ।

২০০২ সালে পার্কের পূর্ব-উত্তর কোণে গড়ে তোলা হয় সিটি কর্পোরেশনের ২৩ নম্বর ওয়ার্ড অফিস। এরপর ২০০৫ সালে পার্কের পশ্চিম-উত্তর পাশে নির্মাণ করা হয় কেসিসির স্বাস্থ্যকেন্দ্র আরবান প্রাইমীরী হেলথ কেয়ার সেন্টার। ৩টি স্থাপনারই উদ্বোধন করেন কেসিসির তৎকালীন মেয়র শেখ তৈয়েবুর রহমান। পার্কের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে নির্মাণ করা হয়েছে পানির পাম্প ঘর।

এভাবে একের পর এক স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে পার্কটি সংকুচিত করা হয়েছে। কিছু অংশে শিশুদের জন্য দোলনাসহ কয়েকটি খেলনা রাখা হয়েছে। তবে চোরের উপদ্রুবে সেগুলো এখন অকার্যকর। এ অবস্থার মধ্যে ২০১২ সালের ১০ মার্চ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশে স্থাপন করা হয় শেখ রাসেল স্মৃতি সংসদ ও ২৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের অফিস।

প্রায় ১০ মাস ধরে পার্কটির উন্মুক্ত স্থান রয়েছে একটি ঠিকাদারী এজেন্সির নিয়ন্ত্রণে। অফিস স্থাপনের জন্য প্রতিষ্ঠানটি সিটি কর্পোরেশন থেকে পার্কের কিছু অংশ ভাড়া নেয়। অনুমতি পাওয়ার পর পুরো পার্কের উন্মুক্ত স্থান বালু, পাথর কুচি, নুরী, রডসহ বিভিন্ন নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে ভরেছে তারা।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মৌসুমী ইসলাম বলেন, ছাত্র-ছাত্রী, কর্মজীবী মানুষ কাজ শেষে পরিবার-পরিজন নিয়ে পার্কে ঘুরতে আসত। পার্কে বসার জায়গা ও দেখার মতো কিছু না থাকায় বর্তমানে তেমন কেউ আসে না।

SAMSUNG CAMERA PICTURES
ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে গোলকমনি শিশু পার্কের রাইডারগুলো।

গোলকমনি পার্কের পাশের বাসিন্দা গকুল রায় গকাই বলেন, এই শিশু পার্কটি এখন আর শিশুদের দখলে নেই। সন্ধ্যা হলেই দেখা মেলে মাদকসেবীদের আনাগোনা। তারা দল বেঁধে পার্কে বসে প্রকাশ্যেই নেশা করে।

জনউদ্যোগ খুলনার আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট কুদরত-ই খুদা বলেন, খুলনার শিশু পার্ক শিশুদের ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। বিশেষ করে জাতিসংঘ পার্কটি আধুনিকায়নের জন্য আন্দোলন করেছি। সেই পার্ককে মেলার মাঠে রূপান্তরের চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি জানান, কেসিসির মেলার মাঠ তৈরির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে পার্কের সামনে মানববন্ধন করা হয়েছে। তারপরও কেসিসিকে বিরত করা যায়নি।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাই্লে কেসিসি মেয়র মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, পার্কগুলো শিশুদের জন্য কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। শিগগিরই এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

জাতিসংঘ পার্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শহরে জায়গার সঙ্কট রয়েছে। শিশুদের খেলাধুলা ও বিভিন্ন মেলার আয়োজন সবই গুরুত্বপূর্ণ। পার্কের একপাশে শিশুদের জন্য খেলাধুলার ব্যবস্থা থাকবে। অন্যপাশ উন্মুক্ত থাকবে মেলার জন্য।