‘ব্র্যাক ব্যাংকের ঋণ থেকে বাঁচার আঁকুতি ‘

0
89
brac_bank
ব্র্যাক ব্যাংকের একটি শাখার সাইনবোর্ড
brac_bank
ব্র্যাক ব্যাংকের একটি শাখার সাইনবোর্ড

ব্যাংকিং খাতে অনেকটা লাগামহীনভাবে চলছে বেসরকারি খাতের ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেড। ব্যাংকটি একদিকে যেমন গ্রাহকদের আমানতে সুদ কম দিচ্ছে, অন্যদিকে আমানত থেকে দেওয়া ঋণে সুদ নিচ্ছে সবচেয়ে বেশি। অপরদিকে সব ধরনের ঋণে ব্যাংকটির সুদের হার এখনও সবচেয়ে বেশি। এসএমই ঋণে ১৮ শতাংশের মধ্যে সুদের হার নির্ধারণ করার কথা থাকলেও তারা নিচ্ছে ২২ থেকে ২৪ শতাংশ। তাছাড়া বিভিন্ন সার্ভিস চার্জের নামেও অতিরিক্ত টাকা আদায় করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে এমন তথ্যই উঠে এসেছে।

ব্র্যাক ব্যাংক থেকে এসএমই ঋণ নেওয়া এক গ্রাহক সম্প্রতি ব্যাংকটির ঋণের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পেতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আঁকুল আবেদন করেছে। তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকটির ১১টি শাখা পরিদর্শনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর সে পরিদর্শনে ব্যাংকটির বিরুদ্ধে গ্রাহকদের এমন ঠকানোর চিত্র পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, ব্র্যাক ব্যাংক ঋণ ছাড়ের শুরুতে জীবনবীমা, অগ্নিবীমা, প্রসেসিং ফি প্রভৃতি বাবদ একটি অংশ কেটে নেওয়ার পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের মোট ঋণের ওপরও উচ্চহারে সুদ নিচ্ছে। ক্ষুদ্র এসব উদ্যোক্তার কাছ থেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকানার কাগজ, জামিনদারের ব্যক্তিগত গ্যারান্টি এবং পোস্ট-ডেটেড চেক এবং বিভিন্ন বীমার প্রিমিয়াম গ্রহণের পরও ‘হাই রিস্ক গ্রুপ’-এ অন্তর্ভূক্ত করে বেশি প্রিমিয়াম আদায় করছে ব্যাংকটি। আর এসব অযৌক্তিক সার্ভিস চার্জ ও সুদহার নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছে খোদ বাংলাদেশ ব্যাংক। তাই ব্যাংকটির কাছে এ ধরনের সার্ভিস চার্জ ও সুদহার আরোপ করার ব্যাখ্যা চেয়েছে ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক এ সংস্থাটি।

ঘটনার বিবরণে জানা গেছে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নিত্যানন্দ রায় ব্র্যাক ব্যাংকের নবাবপুর শাখাধীন সিদ্দিকবাজার এসএমই ইউনিট থেকে ১৮ দশমিক ৮০ শতাংশ হারে পাঁচ লাখ টাকার একটি এসএমই ঋণ উত্তোলন করেন। ওই টাকা থেকে ব্যাংক ২৭ হাজার ৪৫০ টাকা জীবনবীমা, অগ্নিবীমা, প্রসেসিং ফি বাবদ কেটে রাখে। এতে তিনি কার্যত চার লাখ ৭২ হাজার ৫৫০ টাকা তুলতে পারেন। ব্যবসায়ের পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় তিনি নতুন ঋণের জন্য আবেদন করেন। এতে ব্যাংক আরও সাত লাখ ৫০ হাজার টাকা অনুমোদন করে। ব্যাংক এ গ্রাহকের আগের বকেয়া কিস্তি পরিশোধ দেখিয়ে তিন লাখ ৬৮ হাজার টাকা ছাড় করে। গ্রাহক এ পর্যন্ত প্রায় ছয় লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন। কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্যের মন্দায় মাসিক কিস্তি ২৮ হাজার ৯১৩ টাকা তার পক্ষে পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই গ্রাহক দ্বিতীয় ঋণের মঞ্জুরিপত্র সংগ্রহ করতে পারছেন না। আগের বকেয়া পরিশোধ হলেও ব্যাংক গ্রাহকের কাছে আরও ৪৬ হাজার টাকা দাবি করছে। এ ছাড়া জীবনবীমা ও অগ্নিবীমার কোনো পলিসিও তাকে দেয়া হয়নি।

ব্র্যাক ব্যাংকের এ গ্রাহক অভিযোগ করেন, ব্যাংক দ্বিতীয়বার ঋণ মঞ্জুরিতে অতিরিক্ত অর্থ কেটে রেখেছে এবং তার অজ্ঞাতে অতিরিক্ত সুদ ধার্য করেছে। তাছাড়া তাকে বিভিন্নভাবে চাপও প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। এমন পরিস্থিতিতে তিনি ব্যাংকের এ ঋণের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পেতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ব্র্যাক ব্যাংক গত ১ আগস্ট থেকে বিভিন্ন ধরনের আমানত সংগ্রহে শূন্য থেকে ১১ শতাংশ সুদ নির্ধারণ করেছে। এতে ব্যাংকটির আমানতে গড় সুদহার ৮ দশমিক ৫০ শতাংশের বেশি হয় না। অন্যদিকে, ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডে ৩০ শতাংশ, ভোক্তা ঋণে ২০ শতাংশ, ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পে ১৩ দশমিক ৮০ থেকে ১৮ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং কৃষিঋণে ১০-১৩ শতাংশ পর্যন্ত উল্লেখ করেছে। এতে ব্যাংকের গড় সুদহার ১৮ শতাংশের কম হয় না। ফলে ব্যাংকটির ঋণ-আমানতে সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৫০ শতাংশীয় পয়েন্ট, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত সীমা পাঁচ শতাংশীয় পয়েন্টের অনেক বেশি।

ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান অতিরিক্ত চার্জ আদায়ের কথাটি অস্বীকার করে অর্থসূচককে বলেন, আমরা কোনো অতিরিক্ত চার্জ আদায় করছি না। ব্যাংকের সিডিউল অব চার্জে যেটা লেখা আছে আমরা সেটাই আদায় করছি। তাছাড়া ব্যাংকটির সুদ ধার্যের বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অবহিত করা আছে বলে তিনি জানান। ঋণ প্রদান ও আদায়ে সব ধরনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
এসএই/