মহানবীর কবর সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা!

0
151
masjid-nabawi-2
মসজিদে নববী

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর রওজা মোবারক (কবর) মসজিদে নববী থেকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

সোমবার এক খবরে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, মসজিদে নববীর তদারকদের কাছে পাঠানো কনসালটেশন ডকুমেন্টে এমন প্রস্তাবনা রয়েছে। সৌদি আরবের এক শীর্ষস্থানীয় আলেম প্রথম এই পরিকল্পনার কথা ফাঁস করেন।

Masjid a Nabawi
মসজিদে নববী।

৬১ পৃষ্ঠার ওই ডকুমেন্টে মুহাম্মদ (সা.) এর দেহাবশেষ সৌদি আরবের মদিনায় অবস্থিত মসজিদে নববী থেকে জান্নাতুল বাকী কবরস্থানে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য মুসলিম প্রতিবছর মসজিদে নববী পরিদর্শনে যান। অনেকে মুহাম্মদ (সা.) এর রওজায় দোয়া প্রার্থনা করেন। সৌদি সরকারের মতে, এ ধরনের আচরণ ইসলামে কঠোরভাবে ‘নিষিদ্ধ বা শিরক’।

যদিও এ নিয়ে ইসলামের বিভিন্ন শাখায় মতভেদ রয়েছে। যেমন- সৌদিতে জনপ্রিয় ওহাবী মতবাদ একে শিরক বলে বিবেচনা করে। আবার মূল ধারার সুন্নি এবং শিয়ারা একে প্রার্থনার অংশ বলেই মনে করেন।

প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, শিরক ঠেকাতে মুহাম্মদ (সা.) এর দেহাবশেষ স্থানান্তর করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। যদিও এ পর্যন্ত সৌদি সরকার সে পরিকল্পনা অনুসারে কাজ করার কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

তবে এ ধরনের উদ্যোগ মুসলিমদের মধ্যে নতুন করে বিভাজন ও সংঘাত ছড়িয়ে দিতে পারে বলে আশংকা করছেন দেশটির ইসলামি চিন্তাবিদরা। কেননা, সুন্নি এবং শিয়া উভয় সম্প্রদায় মুহাম্মদ (সা.) এর রওজাকে পবিত্র স্থান মনে করে। তাই তাঁর রওজায় হস্তক্ষেপ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে দাঙ্গা ছড়িয়ে দিতে পারে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

Masjid a Nabawi Inside
মসজিদে নববীতে প্রার্থনারত মুসল্লি।

এ সম্পর্কে রিয়াদে অবস্থিত ইসলামিক হেরিটেজ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের পরিচালক ড. ইরফান আল-আলাবি বলেন, আমি নিশ্চিত এটা মুসলিম বিশ্বে আলোড়ন ফেলে দেবে।

তিনি বলেন, মুসলিমরা মুহাম্মদ (সা.) এর রওজা এবং এর আশপাশ পরিদর্শন করে। এখানেই মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর পরিবার বসবাস করতেন এবং অনেকে রওজার দিকে তাকিয়ে প্রার্থনা করেন।

তিনি জানান, তারা (ওহাবীরা) এটাকে ‘শিরক’ মনে করে। তাই সফরকারীদের শ্রদ্ধা জানানো এবং ভ্রমণ থেকে বিরত রাখতে মুহাম্মদ (সা.) এর রওজা জান্নাতুল বাকীতে সরিয়ে নিতে চায় তারা।

আল-আলাবি বলেন, সৌদি আরবের দুই প্রধান মসজিদের তদারকদের কাছে ইতোমধ্যেই প্রস্তাবনাটি পাঠানো হয়েছে। রিয়াদের ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সৌদ ইসলামিক ইউনিভার্সিটির শিক্ষক আবদুল আজিজ আল শাবাল এ প্রস্তাবনা তৈরিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

ইন্ডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, মসজিদের তদারকদের জার্নালে ইতোমধ্যেই এ প্রস্তাবনার কিছু অংশ প্রকাশ করা হয়েছে। এতে মহানবীর রওজার আশপাশের কক্ষগুলো ভেঙ্গে ফেলার কথা বলা হয়েছে। এ কক্ষগুলো তাঁর কন্যারা এবং স্ত্রীরা ব্যবহার করতেন। মুহাম্মদ (সা.) এর ছোট মেয়ে হযরত ফাতেমা (রাঃ) শিয়াদের কাছে খুবই সম্মানিত ব্যক্তিত্ব।

শিয়ারা ফাতেমা এবং তাঁর স্বামী হযরত আলী (রা.) এর অনুসারী।

ইন্ডিপেনডেন্ট আরও জানিয়েছে, প্রস্তাবনায় মুহাম্মদ (সা.) এর রওজার ওপরে অবস্থিত সবুজ গম্বুজ এবং সবশেষে মুহাম্মদ (সা.) এর দেহাবশেষ নিকটস্থ কবরস্থান জান্নাতুল বাকীতে সরিয়ে ফেলার কথা বলা হয়েছে।

আল-আলাবি বলেন, ‘এর মাধ্যমে মহানবী চিহ্নহীন হবেন’

প্রসঙ্গত, জান্নাতুল বাকীতে মুহাম্মদ (সা.) এর পরিবারের সদস্য এবং ইসলামের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কবর রয়েছে।

Masjid al Haram
কাবা শরীফে তওয়াফ করছে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা।

আল আলাবি জানান, ১৯২৪ সালে জান্নাতুল বাকীর সব কবরের নামফলক ধ্বংস করে দিয়েছিল সৌদি সরকার। আর ১৯৭০ সালে মুহাম্মদ (সা.) এর পিতা আবদুল্লাহর কবর সেখানে স্থানান্তর করা হয়।

তিনি বলেন, ‘মহানবীর রওজার আশেপাশের সবকিছু ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। এর চারপাশ বুলডোজার ঘিরে রেখেছে। এভাবে তারা ধীরে ধীরে মসজিদে নববীর দিকে এগিয়ে যাবে। ওই সময় ইমাম হয়তো বলবেন, মসজিদের আয়তন বাড়াতে হবে এবং এটা এভাবেই করে ফেলা হবে। আর সবার চোখ থাকবে ইরাক এবং সিরিয়ায়।’

‘আমি নিশ্চিত এর ফলে পুরো মুসলিম বিশ্বে ক্ষোভের সৃষ্টি হবে। তাণ্ডবের সূত্রপাত ঘটাবে’, যোগ করেন তিনি।

ইন্ডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, তারা এ ব্যাপারে সৌদি দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়নি।

যদিও এর আগে সৌদি সরকার জানিয়েছে, মক্কা ও মদিনার দুই পবিত্র মসজিদ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো খুব গুরুত্ব সহকারে তদারক করা হয়।

প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইন্ডিপেনডেন্ট এর আগে কাবা শরীফ সম্প্রসারণের খবর প্রকাশ করেছিল। ওই খবরে কয়েক কোটি পাউন্ড ব্যয়ে বিলাসবহুল হোটেল, অ্যাপার্টমেন্ট এবং শপিং মল গড়ে তুলতে মক্কার হাজার বছরের পুরানো ভবন এবং স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলার কথা বলা হয়েছিল।

সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহ সম্প্রসারণে কাজ দেখভাল করার দায়িত্ব ওহাবী ধর্মগুরু এবং কাবার ইমাম আবদুল রহমান আল সুদাইসকে দিয়েছেন।

প্রতিবেদন বলা হয়, মহানবীর রওজা ঘিরে তৈরি মসজিদে নববীর সংস্কার হয়েছে বিভিন্ন সময়ে; বিশেষ করে, অটোম্যানদের শাসনামালে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন শিল্পকর্ম। এগুলোতে মহানবী ও তাঁর পরিবার সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে।

ড. আলাবি বলেন, সৌদি সরকারের পরিকল্পনার মধ্যে মহানবীর রওজাসহ (সবুজ গম্বুজ) এসব শিল্পকর্ম ধ্বংস করার কথা রয়েছে।