দেড় বছরে বন্ধ হল ৪শ কারখানা

0
121
garments-worker
পোশাক কারখানায় কাজ করছেন শ্রমিকরা
garments-worker
পোশাক কারখানায় কাজ করছেন শ্রমিকরা

নানা সঙ্কটে গত দেড় বছরে বন্ধ হয়ে গেছে ৩৯৯ টি তৈরি পোশাক কারখানা।এর মধ্যে বিজিএমইএভূক্ত কারখানা বন্ধ হয়েছে ২০৭টি কারখানা। আর বিকেএমইএভূক্ত ১৯২টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনা, পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্ডার বাতিল, মজুরি বৃদ্ধি, কম্প্লায়েন্স ইস্যু, সাব-কন্ট্রাক্ট ও শেয়ার্ড বিল্ডিংয়ে কাজ না পাওয়ার কারণে এসব কারখানা বন্ধ হয়েছে বলে জানা গেছে।

কারখানাগুলোতে প্রায় ২ লাখ শ্রমিক কাজ করতেন। এদের একটি অংশ অন্যান্য কারখানায় কাজ পেলেও এখনও বেকার রয়েছেন বহু কর্মী। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে বেছে নিয়েছেন অন্য পেশা। কেউবা গ্রামের বাড়িতে গিয়ে নিয়েছেন ঝিয়ের কাজ।

বিজিএমইএ সূত্রে জানা যায়, ক্রেতা জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের পরিদর্শনে বন্ধ হয়েছে ২১টি পোশাক কারখানা। বাকি বন্ধ কারখানার মধ্যে শেয়ার্ড বিল্ডিং ও সাব-কন্ট্রাক্টধারী কারখানা প্রায় ৮৫ শতাংশ। আর প্রায় ১৫ শতাংশ কারখানা মালিকরা স্থানান্তর করেছেন।

ঈদের আগে প্রায় আরও ২০টি সাব-কন্ট্রাক্টধারী কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন মালিকরা। তবে বন্ধের খবর বিজিএমইএ’র কাছে আসেনি। আবার নিজের কারখানায় নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি রয়েছে বুঝে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের পরিদর্শনের আগেই শ্রমিকদের বেতন দিয়ে কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও নাকি ঘটেছে। এভাবে ছোট, সাব-কন্ট্রাক্টধারী কিংবা শেয়ার্ড বিল্ডিংয়ের কারখানা বন্ধ হয়েছে আরও দেড় শতাধিক যা বিজিএমইএই জানেন না। এই ১৬ মাসে কম্প্লায়েন্স কিংবা গুণগতমান সম্পন্ন কারখানা ৫ শতাংশও বন্ধ হয়নি বলে জানা যায়।

১৯৮২ সাল হতে পোশাক কারখানাগুলো বিজিএমইএ থেকে মেম্বারশীপ নিয়ে আসছেন। তারই ধারাবাহিকতায় এখন পর্যন্ত সংগঠটির সদস্য কারখানা রয়েছে ৫ হাজার ৭৫১টি। যার মধ্যে ১২১৫টি কারখানা ডিফোল্ডার করে দেওয়া হয়েছে। ২০১২ সালে বিজিএমইএ থেকে ২০০ পোশাক কারখানাকে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। আর ২০১৩ সালে ১৪০ ও ২০১৪ সালে নতুন আরও ৮০টি কারখানাকে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে।

সংগঠনটি থেকে গত জুলাই- ২০১৪ মাসে ইউডি (ইউটিলাইজেশন ডিক্লিয়ারেশন) নিয়েছে ১৯৫৮টি কারখানা যা গত জুন মাসে ছিল ২০৫১টি। তবে কারখানা বন্ধের যে ধারাবাহিকতা তাতে গত আগস্ট মাসে ইউডি নেওয়ার সংখ্যা আরও কমতে পারে।

তৈরি পোশাক শিল্পে ৪ বছর ধরে কাজ করেন জামালপুরের সরিষাবাড়ির ফিরোজ মিয়া। মিরপুরের ন্যাচারাল উল-ওয়্যার লিমিটেড কারখানায় নিটিং অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন তিনি। বেশ কয়েক বছর হলো বিয়ে করেছেন। মা-বাবাসহ পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য তাকে প্রতি মাসে টাকা পাঠানো লাগত।

তবে অ্যাকর্ডের প্রতিনিধি দলের কারখানা পরিদর্শনে ভবনটি ঝূঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। তাতে গত ১৩ এপ্রিল কাজের পর থেকে কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। কাজ না থাকায় এখন রিক্সা চালাচ্ছেন ফিরোজ।

সাতক্ষীরার নাজমা আক্তার কাজ করতেন পল্টনে ওপেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠান মিতি অ্যাপারেলসে। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। দুই সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে নতুন কারখানায় কাজ পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। তবে শেষমেষ কাজ না পেয়ে চলে গেছেন গ্রামে। নিয়েছেন ঝিয়ের কাজ।

বরিশালের লিপি আক্তার কাজ করতেন তোবা ফ্যাশনে। কারখানা বন্ধ তাই এখন বেকার তিনি। ঝালকাঠির জাকিয়া, টাঙ্গাইলের মর্জিনা, নীলফামারির রেবেকা এখনও চাকরি খুজচ্ছেন। যমুনা ফ্যাশন ওয়্যারের রেবেকা এখনও কাজ পাননি।

বিজিএমইএ সহ-সভাপতি শহীদুল্লাহ আজীম অর্থসূচককে জানান, রানা প্লাজার পর থেকে এতো কারখানা বন্ধের মূল কারণ হলো এই শিল্পের নেতিবাচক প্রভাব। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্ডার বাতিল, মজুরি বৃদ্ধি, কম্প্লায়েন্স ইস্যু ও শেয়ার্ড বিল্ডিংয়ে কাজ না পাওয়ার কারণে কারখানা বন্ধ হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, এক বছরে পোশাকখাতে এতো কারখানা বন্ধ হওয়া শিল্পের জন্য সুখবর বয়ে আনেনি। এখন বহু শ্রমিক বেকার রয়েছে।প্রতিদিন কোনো না কোনো কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

বিকেএমইএ সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম অর্থসূচককে বলেন, গত বছর সংগঠনটির ৯২০টি কারখানা চালিয়ে আসছিল। তবে রানা প্লাজার পর থেকে এখন পর্যন্ত নানা কারণে বন্ধ হয়েছে ১৯২টি কারখানা। আবার নতুন করে কারখানার নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে ৮০০ প্রতিষ্ঠানকে। যে সব কারখানায় কাজ করতেন প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক। এভাবে বন্ধ হতে থাকলে শ্রমিক বেকার ও শিল্পখাত ধসের মধ্যে পড়বে বলে মনে করেন তিনি।

শ্রমিক নেতা সিরাজুল ইসলাম রনি জানান, রানা প্লাজার পর থেকে যে সব কারখানা বন্ধ হয়েছে তাতে বহু শ্রমিক বেকার রয়েছেন। অধিংকাশ চাকরি পেলেও অনেকে গেছেন দেশের বাড়িতে। বেকার রয়েছেন ৫০ হাজারেরও বেশি শ্রমিক। আবার অন্য পেশা গ্রহণ করেছেন অনেকে।

শ্রমিকদের চাকরির বিকল্প ব্যবস্থা না করে কারখানা বন্ধ করা আত্মঘাতি কাজ হবে। এতে করে শ্রমিকরা আরও বেকার হবে বলে জানান তিনি। তিনি বন্ধ হওয়া কারখানার শ্রমিকদের ক্ষতি দাবি করেন।