বাহরাইনে কর্মহীন হাজারো বাংলাদেশি

0
73
Bahrain-World-Trade-Centre
বাহরাইনে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার
Bahrain-World-Trade-Centre
বাহরাইনে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার

বাহরাইনে কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন অনেক বাংলাদেশি। লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে দেশটিতে গিয়ে দীর্ঘদিন বেকার থেকে ফিরে এসেছেন কেউ কেউ। তবে দেশের দেনা শোধ করতে সেখানে যেকোনো ধরনের কাজের অপেক্ষায়ও আছেন হাজার হাজার বাংলাদেশি। ভুক্তভোগীরা এমন তথ্য জানালেও সরকার বলছে- তাদের কাছে এমন অভিযোগ নেই।

ভুক্তভোগী বাহরাইন প্রবাসীরা আরও জানিয়েছেন, বাংলাদেশের প্রধান বৈদেশিক শ্রমবাজার সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে জনশক্তি রফতানি সরকারিভাবে বন্ধ থাকায় শ্রমিকরা বাস্তব পরিস্থিতি না জেনে বাহরাইন যাওয়ায় কর্ম সংকটে ভুগছেন। অতীতে এক সময় দেশটিতে অনেকেই ব্যবসায়িকভাবে প্রতিষ্ঠিত হলেও বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক অবস্থায় নতুনভাবে সফল হওয়া কঠিন বলেও জানিয়েছেন তারা।

বাহরাইনের রাজধানী মানামায় কাজ করেন চাঁদপুরের খোকন। ইন্টারনেটে তিনি অর্থসূচককে জানিয়েছেন তার কষ্টের কথা। খোকন জানান, পরিবারের একমাত্র ফসলি জমি বিক্রি করে সাড়ে তিন লাখ টাকায় বাহরাইন গিয়েছেন।৫০ হাজার টাকা বেতনে এসি রুমে বড় কোম্পানিতে অফিস বয়ের চাকুরি হওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু সেখানে গিয়ে চাকরি পান ক্লিনিং কোম্পানিতে। যোগদানের কিছুদিন পর তিনি জানতে পারেন- তার কোম্পানি তাকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বাহরাইন নিয়েছে এবং তার টাকার পুরাটাই দালালরা নিয়েছে।

খোকন জানান, সেখানে এখন তার সাপ্তাহিক বা মাসিক কোনো ছুটি নেই। বেতন যা পান তাতে বাসা ভাড়া ও খাওয়া খরচ বাদে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকার বেশি থাকে না।

অনেকেই টাকা খরচ করে বাহরাইন গিয়ে এখন বেকার- একথা জানিয়ে তিনি বলেন, কষ্ট হলেও চাকরি করছি। আল্লাহর কাছে হাজার শোকর।

বাহরাইনে দীর্ঘদিন বেকার থেকে দেশে ফিরে এসেছেন কুমিল্লার লাঙ্গলকোটের জাহাঙ্গীর আলম। চাষের জমি ও হালের বলদ বিক্রি করে চার লাখ টাকা খরচায় দু’বছর আগে বাহরাইন যান তিনি। জাহাঙ্গীর জানান, প্রথম চার মাস চাকরি ছাড়া থাকার পর একটি রেস্তোরাঁয় কাজ জোটে। সেখানে বেতন অনেক কম হওয়ায় কাজ নেন নির্মাণ শ্রমিকের। প্রচণ্ড গরমে কঠোর পরিশ্রম করেও উপার্জিত টাকা বাসা ভাড়া ও খাওয়ায় চলে যাওয়ায় সম্প্রতি দেশে ফিরে এসেছেন তিনি। আসার খরচ বাদ দিয়ে দুই বছরে তার আয় মাত্র দুই লাখ টাকা।

তিনি অভিযোগ করেন, দালালের মন ভোলানো কথায় স্বচ্ছলতার আশায় বাহরাইন গিয়ে সব হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন।

জাহাঙ্গীর ও খোকন জানান, বাহরাইনে তাদের মতো প্রায় ৩০ বাংলাদেশি কর্মহীন ও মানবেতর জীবন-যাপন করছে।

খোকন জানান, বাহরাইনে এখন খুব কম লোকই সফল হচ্ছেন। বেশিরভাগ শ্রমিকই বিপদে পড়ছেন। ভারত, পাকিস্তান, নেপালসহ অন্যান্য দেশের স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠনগুলো বিপদগ্রস্ত এসব শ্রমিকের কাজ ও পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করলেও বাংলাদেশিদের জন্য সে ধরনের কোনো সংগঠন নেই। দু-একটি সাইনবোর্ড সর্বস্ব সংগঠন থাকলেও তাদের কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ।

জনশক্তি রপ্তানি ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য মতে, চলতি আগস্ট মাসের ২৫ তারিখ পর্যন্ত বাহরাইনে বৈধভাবে ২ লাখ ৮৬ হাজার ২০৮ জন বাংলাদেশি রয়েছে। এর মধ্যে শ্রমিক রয়েছে দুই লাখের মতো।

তবে বাহরাইন সরকারের কাছে রয়েছে ভিন্ন চিত্র। দেশটির জনশক্তি আমদানি বিষয়ক সর্বোচ্চ সরকারিপ্রতিষ্ঠানলেবার মার্কেট রেগুলেটরি অথোরিটির (এলএমআরএ) তথ্য মতে, বাহরাইনে বর্তমানে কর্মরত প্রায় ছয় লাখ বিদেশি কর্মীর মধ্যে এক লাখ বাংলাদেশি।

সবচেয়ে বেশি বিদেশি কর্মী রয়েছে ভারতের, ৫৫ শতাংশ। বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা ১৬ শতাংশ। বাংলাদেশি কর্মীরা কাঠমিস্ত্রি, মুদি দোকান, দর্জি দোকান, হেয়ার ড্রেসিং শপ, ট্রলারে করে মৎস্য শিকার, রেস্তোরাঁয় শেফ ও কুক, কৃষি ও বনায়ন খাতে কর্মরত।

বাহরাইন সরকারের হিসাবে বাইরের বাংলাদেশিরা বেকার অথবা অবৈধভাবে কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন সেখানে কর্মরত বেশ কয়েকজন শ্রমিক।

বাহরাইনে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. খোন্দকার শওকত হোসেন অর্থসূচকে বলেন, বাহরাইনে বাংলাদেশি শ্রমিকরা মানবেতর জীবন-যাপন করছেন- এমন অভিযোগ আমাদের কাছে নেই। তবে যারা ব্যক্তিগত ভিসায় ও দালালদের মাধ্যমে সেখানে গিয়েছেন তারা সমস্যায় পড়বে। আমরা দালালদের দৌরাত্ম বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছি।

বাহরাইনে বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন পরিসংখ্যানের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের কাছে শুধু যারা শ্রমিক হিসেবে বিদেশ গমন করেন তাদের তথ্য রযেছে। ফিরে আসার কোনো হিসাব নেই। তাই অনেকে চাকরি ছেড়ে চলে আসলে সেটা ওই দেশের সরকারের তালিকা থেকে বাদ গেলেও আমাদের তালিকায় রয়ে গেছে।