হট সিটে এবার যৌনপল্লির বধূ!

0
84
wife
হট সিটে এবার যৌনপল্লির বধূ ফাতিমা- ফাইল ছবি
wife
হট সিটে এবার যৌনপল্লির বধূ ফাতিমা- ফাইল ছবি

এ এক অন্য গুলাব গ্যাং, অন্য মর্দানি। এ গল্পের নাম ফাতিমা খাতুন। নারী পাচার ঠেকাতে শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো আঠাশ বছরের গৃহবধূ।

মাত্র ৯ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল ফাতিমার। শ্বশুরবাড়ির সকলেই কোনো না কোনো ভাবে নারী পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তখন থেকে ফতিমা একা লড়াই করে আসছেন। নিজেকে বাঁচানোর লড়াই, পাচার হয়ে যাওয়া মেয়েদের বাঁচানোর লড়াই।

‘মার্দানি’ ছবির শিবানী শিবাজি রায়ের মতো উর্দির জোর ছিল না তার। বিহারের আরারিয়া জেলার ফরবিসগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোটা প্রায় অসম্ভবই ছিল ফাতিমার পক্ষে। কিন্তু সেটাই সম্ভব করে দেখিয়েছেন ফর্সা-ছিপছিপে সাদামাঠা চেহারার মেয়েটি।

তার সঙ্গে সিনেমার গল্পের মিল পেয়েই অমিতাভ বচ্চন সম্প্রতি ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’র আসরে মুখোমুখি বসিয়েছিলেন রানি মুখোপাধ্যায় এবং ফাতিমাকে।

নেপালের নট সম্প্রদায়ের মেয়ে ফাতিমা বলেছিলেন নিজের জীবনের কথা। পাকা বাড়ি দেখে বাবা-মা বিয়ে ঠিক করেছিলেন কুড়ি বছরের বড় পাত্রের সঙ্গে। তাই ছোটতেই বিয়ে হয়ে ফরবিসগঞ্জে এলেন তিনি।

দেখলেন, স্বামী অধিকাংশ সময়েই মদ খেয়ে পড়ে থাকেন আর বাড়িতে প্রায়ই নতুন নতুন মেয়ে এসে হাজির হন। রোজই ৩ ননদ আর এই মেয়েদের কয়েক জনকে সেজেগুজে বসে থাকতে দেখা যায়। অচেনা সব লোক এসে তাদের নিয়ে ঘরে চলে যায়।

ব্যাপারটা কী, কাউকে জিজ্ঞেস করার সাহস ছিল না তার। প্রায় এক বছর পরে বাইরে থেকে আসা একটি মেয়েই এক দিন ফতিমাকে বলল, তোমার স্বামী আর শাশুড়ি যৌন ব্যবসা চালায়।

কিন্তু সব জেনেশুনে চুপ করে থাকার পাত্রী নন ফাতিমা। এক দিন নেপাল থেকে ১৪-১৫ বছরের তিনটি মেয়েকে বাড়িতে আনলেন স্বামী। তাদের পালানোর পথ করে দিলেন তিনি।

বড় অঙ্কের টাকা হাতছাড়া হল বলে ফাতিমার উপর শুরু হল মারধর। ৩ দিন তাকে ঘরে বন্ধ করে রাখা হল। খাবার-জল কিছুই মিলল না।

ফতিমার লড়াইয়ের সেই শুরু। শারীরিক নির্যাতন, মানসিক পীড়ন কিছুই তাকে আটকাতে পারেনি। তাকে খুন করার জন্য স্বামী যাকে সুপারি দেন, সেই যুবকই ফাতিমার পাশে দাঁড়ান।

ফাতিমার কথায়, আল্লার মেহেরবানি। মুস্তাফাভাই আমাকে বোন বলে ডাকল। সেই থেকে আমি ওর বোন।

পুলিশের খাতায় মুস্তাফা সমাজবিরোধী হলেও ফাতিমার লড়াইয়ে তিনি পাশে রয়েছেন। ধীরে ধীরে ফতিমার কথা পাড়া-পড়শিরা জেনে যান। দাঁতে দাঁত চেপে যৌন ব্যবসার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে থাকেন তিনি।

গল্পের মোড় ঘুরল ২০০৪ সালে। রামপুর গ্রামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে ‘কমিউনিটি সেন্টার’ খোলা হল। যৌনপল্লির ২’-এক জন মেয়ে সেখানে যাওয়া-আসা করছে দেখে তিনিও নাম লেখালেন। তৈরি হল মহিলা মণ্ডল, খোলা হল তাদের নিজস্ব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট।

অন্য একটি সংস্থায় ফাতিমা ও তার ছেলেমেয়েদের লেখাপড়াও শুরু হল। প্রথম প্রথম স্বামী-শাশুড়ি এ সবে মত দেননি। কিন্তু সংস্থার কাজকর্মে হাতে কিছু পয়সা আসছে দেখে নিমরাজি হলেন। ফাতিমা এবং ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার চাপে স্বামী নারী-পাচারের ব্যবসাও ছাড়তে রাজি হলেন।

পরে ধীরে ধীরে মহল্লার মেয়েদের নিয়ে ফাতিমা তৈরি করে ফেলেন ২-২’টি মহিলা মণ্ডল নারী জাগরণ এবং নারী ক্রান্তি। ফলে আরারিয়া জেলার প্রতিটি ব্লকে ছড়িয়ে পড়ে তার নাম।
কোনো মেয়ের উপরে অত্যাচারের খবর পেলেই মহিলা সদস্যদের নিয়ে পৌঁছে যেতেন তিনি। অনেকটা উত্তরপ্রদেশের সম্পত রাই আর তাঁর গুলাব গ্যাং-এর ঢংয়েই অত্যাচারী পুরুষকে মারতে মারতে থানায় নিয়ে যেতেন তারা।

এমনকি আন্তঃরাজ্য পাচার চক্রের অন্যতম মাথা গেইনুকে এ ভাবেই ধরিয়ে দিয়েছিলেন তারা।

ফাতিমার দাবি, তার এলাকার ৮০ শতাংশ বাড়ি থেকে যৌন ব্যবসা তুলে দেওয়া হয়েছে। এলাকা থেকে যৌনব্যবসা এবং নারী পাচার বন্ধ করেই ছাড়ব বলেও সংকল্প তার।

আরারিয়া জেলার পুলিশ সুপারও তার লড়াইকে স্বাগত জানিয়ে ঘোষণা করেছেন, যৌনপল্লিতে মেয়ে পাচার বন্ধ করবেন। যে মেয়েরা এখনও বিপদের মধ্যে রয়ে গিয়েছেন, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে।

সম্প্রতি ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’-র হটসিটে ফাতিমা জিতে নিয়েছেন ২৫ লাখ টাকা।

তার স্বপ্ন, উদ্ধার হওয়া মেয়েদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল তৈরি করব এই টাকা দিয়ে।

তবে স্ত্রীর সাফল্যে খুব একট খুশি নন তার স্বামী। তাই বাড়িতে সংবাদমাধ্যমের আনাগোনা নিয়ে ফাতিমাকে মাঝে-মাঝেই ব্যঙ্গ করে যাচ্ছেন তিনি।

আর ফাতিমার প্রতিক্রিয়া? তার গলাতেও খেলে যাচ্ছে করুণ ঠাট্টার সুর, ক’দিন আগে যারা আমাকেই পারলে বেচে দিতেন, তারা আজ মুখে অন্তত আমার সঙ্গে লড়াইয়ে থাকার কথা বলছেন। এই বা কম কী?

এএসএ/