‘প্রধানমন্ত্রী কি আমাদের কান্না শুনতে পান না !’

0
52
gooom
ি
gooom
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস ২০১৪ উপলক্ষে মৌলিক অধিকার সুরক্ষা কমিটির জাতীয় সম্মেলনে এভাবেই ২৫টি পরিবার তাদের স্বজন হারানোর ব্যথা ব্যক্ত করেন। শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তন থেকে তোলা ছবি।

‘কানতে কানতে হারিয়ে গেছে কান্না। উনি (প্রধানমন্ত্রী) বঙ্গবন্ধুর কন্যা । তিনিও তো স্বজনহারা। স্বজনহারা ব্যথা তিনি তো বুঝেন। উনি তো আমাদের সঙ্গে এক কাতারে দাড়াঁতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী কি আমাদের কান্না শুনতে পান না।’

স্বামী হারা ক্ষত নিয়ে এভাবে কথাগুলো বলছিলেন ৯ মাস আগে গুম হওয়া হুমায়ুন কবির পারভেজের স্ত্রী শাহানাজ।

পারভেজকে লাকসাম থেকে র‌্যাবের পরিচয়ে কয়েকজন ডেকে নিয়ে যায়। এরপর ৯ মাস পেরিয়ে গেলেও তার কোনো খোঁজ মেলেনি। যদিও শাহানাজের বিশ্বাস এখনও তার স্বামী বেচেঁ আছেন।

শাহানাজ বলেন, ‘আমার স্বামী বেচেঁ আছে নাকি মরে গেছে এখনো তা জানি না। তবে বিশ্বাস করি তিনি বেচেঁ আছে।’

শুধু শাহানাজ নয় তার মধ্যে অনেকেই স্বজন হারানোর ব্যথা নিয়ে দিন পার করছেন, কিন্তু এখনও জানতে পারেন নি তার নিখোঁজ হওয়া স্বজনটি বেচেঁ আছে নাকি মরে গেছে।

শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস ২০১৪ উপলক্ষে মৌলিক অধিকার সুরক্ষা কমিটির জাতীয় সম্মেলনে এভাবেই ২৫টি পরিবার তাদের স্বজন হারানোর ব্যথা ব্যক্ত করেন। এ সময় উপস্থিত ছিল দুই শতাধিক পরিবার।

নাইমুন হাসিন রেনী ভাইয়ের ছবি বুকে চাপিয়ে ধরে অশ্রু নয়নে বলেন, ‘আমার ভাইকে র‌্যাবের ৬নং ব্যাটেলিয়ন সদস্যের পরিচয়ে তুলে নিয়ে যায়। কি কারনে আমার ভাইকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নিয়ে যায় তা আমরা আজও জানতে পারি নাই। বেচেঁ আছে না মরে গেছে তাও জানি জানি না। যদি তাকে মেরে ফেলা হয় তাহলে তার লাশটা অন্তত ফিরে দিন। আমরা কি স্বজনের লাশটি পাওয়ারও অধিকার রাখি না?  দয়া করে আমার ভাইয়ের লাশটি দিয়ে দিন।’

তিনি বলেন, ‘আমার বাবা তার একমাত্র সন্তান হারানো ব্যথা কিছুতেই ভুল পারছেন না। কয়েকদিন পর পর তিনি মুর্ছা হয়ে যান। সন্তানের শোকে তিনি অসুস্থ হয়ে গেছেন।’

নাইমুন হাসিন রেনীর ভাই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র এস এম অন্তিম পারভেজ রাশেদ এক বছর আগে নিখোঁজ হন।এরপর তার আর খোঁজ পাওয়া যায় নি।

অশ্রুসিক্ত দুইচোখে ছেলের ছবি নিয়ে এসেছেন বংশাল থানার ছাত্রদলের সভাপতি মো: জহিরের বাবা ফিরাজুল ইসলাম।

চাপা চাপা কন্ঠে ফিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘তার ছেলে বন্ধুর জন্মদিনের ফুল কিনতে রাজধানীর শাহবাগে যায়। কিন্তু বাবা আমার ওই যে গেলো আর ফিরে আসলো না। দেখতে দেখতে ১০টি মাস কেটে গেল কিন্তু আমার জহিরের কোনো খোঁজ আর পেলাম না। থানায় মামলা করতে গিয়েছিলাম, কিন্তু মামলা নেয় নি। তাই শুধু জিডি করেছি।’

চোখ মুছতে মুছতে ভাঙা গলায় তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে গুম কেন হলো? কি অপরাধ ছিল তার?  বিএনপি‘র রাজনীতি করাই কি তার অপরাধ? এই সরকার কি আমার সন্তানকে ফিরে দিবে না?’

রাজধানীর ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার চৌধুরী আলমের মেয়ে মাহফুজা আখতার বলেন, ‘যারা র‍্যাবের হাতে খুন হয়েছেন; প্রিজ প্রধানমন্ত্রী তাদের বিচার করেন। গুমের পরিবেশ আরও গভীর হওয়ার আগেই আপনিই সেটি ভেঙ্গে ফেলতে পারেন।’

‘আমার বাবা ফির আসবেই। তাকে কেউ মেরে ফেলতে পারে না। আমি প্রতিমূহুর্তে আশায় থাকি ওই বুঝি বাবা আসলো এবং বলবে মা তুমি কেমন আছ?’  এভাবেই বাবা ফিরে আসবেন এই দৃঢ বিশ্বাস নিয়ে আছেন লাকসামের সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামের হিরুর মেয়ে মাসরুফা ইসলাম। গত বছর ২৭ নভেম্বর গুম হন সাইফুল ইসলাম।

এভাবেই নিজের স্বজন হারোনো অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আল মুকাদ্দেসের বাবা আব্দুল হালিম, সাজেদুল ইসলামের ছোট বোন সানজিদা ইসলাম, মেহেরপুরে ক্রসফায়ারে নিহত সাইদুল ইসলামের ভাই তাওফিকুল ইসলাম, শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের স্ত্রী হোসনে আরা বেগম, গুম পারভেজের বোন নাইমুল ইসলাম নেলী, নিজামউদ্দিন মুন্নার বাবা শামসুদ্দিনসহ আরও অনেকে।

প্রসঙ্গত, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০০৬-২০১১ সাল পযর্ন্ত বাংলাদেশে ৩০টির বেশি গুম সংক্রান্ত অপরাধ ঘটেছে। ২০১৩-২০১৪ সালে তা অনেক বেশি বেড়ে গেছে।

এস রহমান/