৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির নথি দুদকে

0
39
সোনালী ব্যাংক ও দুদক
সোনালী ব্যাংক ও দুদক

সোনালী ব্যাংকের ৮টি শাখা থেকে ঋণের নামে জালিয়াতি করে ৩ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছে শতাধিক কোম্পানি। ভুয়া এলসি ও বিলের মাধ্যমে কোম্পানিগুলো ঋণ নিয়েছে। এ সংক্রান্ত নথিপত্র সংশ্লিষ্ট সব শাখা থেকে সংগ্রহ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। নথিপত্র পর্যালোচনা করে শিগগিরই কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানিয়েছে দুদক সূত্র।

সূত্র জানায়, হলমার্ক গ্রুপের বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতির ঘটনা তদন্তকালে আরও শতাধিক প্রতিষ্ঠানের প্রায় কয়েক হাজার কোটি টাকা জালিয়াতি ও বিদেশে পাচারের চাঞ্চল্যকর তথ্য পায় কমিশন। যার সাথে জড়িত রয়েছে ব্যাংকটির ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের আটটি শাখা।

সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তাদের দায়িত্ব অবহেলা ও যোগসাজসে এত বড় জালিয়াতির ঘটনা সংগঠিত হয়েছে বলে মনে করছে দুদক। জড়িত শাখাগুলো হলো- সোনালী ব্যাংকের ঢাকার লোকাল অফিস, বৈদেশিক বাণিজ্য কর্পোরেট শাখা ও চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ কর্পোরেট শাখা, ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউ কর্পোরেট শাখা, আগারগাঁও শাখা, গুলশান শাখা, নারায়ণগঞ্জ কর্পোরেট শাখা এবং চট্টগ্রামের লালদীঘি কর্পোরেট শাখা।

এর আগে, গত বছরের ২ ডিসেম্বর দুদকের উপ-পরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলীর স্বাক্ষরিত চিঠিতে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের এসব শাখা থেকে ঋণ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় নথি সরবরাহের অনুরোধ জানানো হয়। এরপর গত ২৪ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় দফায় নথিপত্র চেয়ে চিঠি দেয় কমিশন। আর এ চিঠির পর দীর্ঘ সাত মাসে শেষে গত মঙ্গলবার সব শাখার নথিপত্র হাতে পায় দুদকের অনুসন্ধান দল।

সূত্র জানায়, বহুল আলোচিত হলমার্ক গ্রুপের চার হাজার ১০০ কোটি টাকার কেলেঙ্কারির তদন্তকালে সোনালী ব্যাংকের নথিপত্র পর্যালোচনা করতে গিয়ে ব্যাংকটির বিভিন্ন শাখার দুর্নীতির প্রমাণ পায় দুদক। ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকের ওইসব শাখার বিরুদ্ধে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ পরিদর্শন ও তদন্ত প্রতিবেদনেও ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে হলমার্কের বাইরেও প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি বেরিয়ে এসেছে। ব্যাংকের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বৈদেশিক বাণিজ্যের নামে ও ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে অনিয়ম ধরা পড়েছে। ডিমান্ড লোন ও ফার্সড লোন সৃষ্টির মাধ্যমেও অনিয়ম করেছে এসব শাখা।

ঋণ জালিয়াতির মধ্যে সোনালী ব্যাংক লোকাল অফিসের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, কেএনএস ইন্ডাস্ট্রিজ, ক্যাংসান ইন্ডাস্ট্রিজ, থারমেক্স  টেক্সটাইল, ইকো কটন মিলস, রহিমা ফুড করপোরেশন নামের কোম্পানিগুলো প্রায় এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা লোপাট করেছে। আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য পরিশোধ না করেই তা খালাস করে নেন আমদানিকারকরা। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, মূল্য পরিশোধ না করা পর্যন্ত আমদানিকৃত পণ্য ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা।

এর মধ্যে  অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের হিসাবে ২০১০ সালে ৩৪ কোটি ও ২০১১ সালে ৯২ কোটি টাকার ডিমান্ড ঋণ নেয়। এপেক্স উইভিং অ্যান্ড ফিনিশিং মিল ২০০৯ সালে ৩ কোটি, ২০১০ সালে ১৯  কোটি ও ২০১২ সালে ৮০ লাখ টাকাসহ তিন বছরে ৭৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকার ঋণ নেয়।

পলি কটন নিট ফ্যাব্রিক্স ২০০৮ সালে ৩৬ কোটি, ২০১০ সালে ৩৫ কোটি ১৬ লাখ, ২০১২ সালে ৪৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকার ডিমান্ড ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে ব্যাংকের অর্থ লোপাট করে।

আর এসএস নিট কম্পোজিটের হিসাবে ২০০৯ সালে ৩ কোটি ৭৫ লাখ, ২০১০ সালে ৩ কোটি ৩২ লাখ ও ২০১২ সালে ৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকার ফোর্সড ঋণ নেয়।

অ্যাকোমুডেশন বিল সৃষ্টি করে ব্যাংক কর্মকর্তাদের সহায়তায় অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, অলটেক্স ফ্যাব্রিক্স, এপেক্স উইভিং এবং ফিনিশিং, পদ্মা পলি কটন, কেএসএস নিট ও পিলুসিড কোম্পানি  প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নিয়েছে।

এদিকে সোনালী ব্যাংক আগারগাঁও শাখা থেকে ২০১১ ও ২০১২ সালে তিন শতাধিক ভুয়া ঋণপত্রের মাধ্যমে গ্রিন প্রিন্টার্স ১৪১ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ অনুসন্ধান চলছে।

 গুলশান শাখা থেকে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে রোজবার্গ, এলএনএস গ্রুপসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ২৮১ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।

মতিঝিল বৈদেশিক বাণিজ্য শাখা থেকে দুইটি ভূয়া বিলের বিপরীতে প্রায় তিন কোটি টাকা পরিশোধের ঘটনাটি বেরিয়ে এসেছে। একটি বিলে এক কোটি ৪০ লাখ, অপরটিতে এক কোটি ৪৬ লাখ টাকা। ঋণ নেয়ার পর ওই ভুয়া দুইটি প্রতিষ্ঠানকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বঙ্গবন্ধু এভিনিউ করপোরেট শাখা থেকে ২৫০ কোটি টাকার চারটি ঋণপত্রের বিপরীতে ব্যাংকের ওই শাখা সরাসরি চার কোটি ৫০ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি এবং এক কোটি ২৫ লাখ টাকার শ্রেণীকৃত ঋণ মঞ্জুরের অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে, ব্যাংকটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন কবীর ও পরিচালনা পর্ষদের একাধিক সাবেক সদস্যের হস্তক্ষেপে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ করপোরেট শাখা বিভিন্ন সময় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা এলটিআর ঋণ দেওয়া হয়েছে একাধিক প্রতিষ্ঠানকে; যা আদায়ের সম্ভাবনা নেই বলেও ব্যাংকের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

আর চট্টগ্রামের লালদীঘি কর্পোরেট শাখা ও নারায়ণগঞ্জ কর্পোরেট শাখা থেকে গ্রাহককে ভূয়া ঋণ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

প্রসঙ্গত, সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা (শেরাটন) হোটেল কর্পোরেট শাখা থেকে হলমার্ক গ্রুপ ও তার সহযোগী ৫টি প্রতিষ্ঠান চার হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি করে। তদন্ত শেষে হলমার্কের চেয়ারম্যান, এমডি ও কর্মকর্তাসহ ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ৪৪টি মামলার চার্জশিট দাখিল করে দুদক।

এইউ নয়ন