কেমন হতে পারে খুলনা প্রিন্টিংয়ের শেয়ার

0
158
kppl-factory
খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং (কেপিপিএল) এর কারখানা
kppl-factory
খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং (কেপিপিএল) এর কারখানা

সোমবার দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জে একযোগে শুরু হবে আলোচিত-সমালোচিত কোম্পানি খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের (কেপিপিএল) শেয়ার লেনদেন।হিসাব কারসাজি করে মুনাফা বাড়িয়ে দেখানোর অভিযোগ মাথায় নিয়ে লেনদেনে আসছে কোম্পানিটি।

এদিকে আগের দুই বছর টানা মুনাফা কমলেও গত ৩০ জুন সমাপ্ত বছরে মুনাফা ২৩ শতাংশ বাড়তে পারে বলে আভাস দিয়েছে কোম্পানিটি।সব মিলিয়ে কেপিপিএলের শেয়ার কেনা-বেচা নিয়ে বেশ ধন্ধে বিনিয়োগকারীরা। তারা একে অপরকে জিজ্ঞেস করছেন- কেমন যেতে যারে কেপিপিএলের শেয়ারের দাম।

শেয়ার দামের যৌক্তিকতা আলোচনার আগে প্রয়োজন কোম্পানিটি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা। কেপিপিএল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) পেপার অ্যান্ড প্রিন্টিং খাতের কোম্পানি হিসেবে তালিকাভুক্ত হচ্ছে।কোম্পানিটি হিমায়িত খাদ্য প্যাকেজিং সংক্রান্ত পণ্য ও সেবার সঙ্গে যুক্ত। লকপুর গ্রুপের সহযোগী এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান তিনটি প্রোডাক্টস হচ্ছে প্রিন্টিং (পলিথিন ও কাগজ), প্যাকেজিং (মাস্টার কার্টন, ইনার কার্টন, স্টিকার, পলি ব্যাগ এবং ল্যামিনেটিং। কোম্পানির আয়ে খাত তিনটির অবদান যথাক্রমে ১৫%, ৬৫% ও ২০%।

কেপিপিএল তার উৎপাদন ক্ষমতার ৭৯ ভাগ ব্যবহার করতে পারছে।আর উৎপাদিত পণ্যের ৬৪ ভাগ বিক্রি করছে গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে।

কোম্পানির আইপিও পরবর্তী পরিশোধিত মূলধন ৬৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা। শেয়ার সংখ্যা ৬ কোটি ৬৪ লাখ। এতে স্পন্সরদের অংশ ৩৪ শতাংশ। বাকী সব শেয়ার আইপিওতে বরাদ্দপ্রাপ্ত সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে। তাদের শেয়ার সংখ্যা ৪ কোটি।

গত ৪ বছরের মধ্যে ২০১০-১১ হিসাববছরে কোম্পানিটি সর্বোচ্চ মুনাফা করেছিল, মুনাফার পরিমাণ ১৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এর পর দুই বছর ধারাবাহিকভাবে মুনাফা কমেছে। ২০১১-১২ সালে মুনাফার পরিমাণ ছিল ১০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। পরের বছর তা কমে হয় ৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। ২০১৩-১৪ হিসাব বছরের প্রথম ৯ মাসে কোম্পানিটি মুনাফা করেছে ৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। বছরের বাকী ৩ মাস একই হারে মুনাফা হয়ে থাকলে বার্ষিক মুনাফার পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৮ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।

কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে, ৩ প্রান্তিক তথা গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সময়ে শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ৯৮ পয়সা। একে বার্ষিকীকরণ (অ্যানুয়ালাইজড) করলে ইপিএস দাঁড়ায় ১ টাকা ৩০ পয়সা।

তাত্ত্বিকভাবে দুটি পদ্ধতিতে শেয়ারের ফেয়ার ভ্যালু বা যৌক্তিক মূল্য অনুমান করা যায়। এর একটি আয়ভিত্তিক তথা মূল্য-আয় অনুপাত হিসেবে, অন্যটি শেয়ারের শেয়ার প্রতি সম্পদ মূল্য (এনএভি) ও শেয়ারের বাজারমূল্য অনুপাতে।

বর্তমানে বাজারে গড় মূল্য-আয় অনুপাত বা পিই রেশিও ১৬ দশমিক ৮। কেপিপিএলের ইপিএস (অ্যানুয়ালাইজড) ১ টাকা ৩০ পয়সা।  এ হিসেবে শেয়ারটির মূল্য দাঁড়ায় ২১ টাকা ৮০ পয়সা।

বাজারে পেপার ও প্রিন্টিং খাতে হাক্কানী পেপার অ্যান্ড পাল্প নামের একটি মাত্র কোম্পানি তালিকাভুক্ত। কোম্পানিটির সর্বশেষ পিই রেশিও ৯৩ দশমিক ৫৭। খাতভিত্তিক সামঞ্জস্যতার আলোকে কেপিপিএলের শেয়ার মূল্য দাঁড়ায় ১২১ টাকা ৬৪ পয়সা। সমজাতীয় কোম্পানিটির অস্বাভাবিক মূল্যের কারণে খাতভিত্তিক পিই রেশিওতে কেপিপিএলের সম্ভাব্য মূল্য হিসাব করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ও অবাস্তব।

বর্তমানে পেপার ও প্রিন্টিং খাতে এনএভি ও শেয়ারের বাজারমূল্য অনুপাত দশমিক ৮। কেপিপিএলের এনএভি ১৬ টাকা ৬০ পয়সা। এ হিসেবে এর শেয়ারের মূল্য দাঁড়ায় ১৩ টাকা ৩০ পয়সা।

আমাদের পুঁজিবাজার এখনও কোনো গ্রামার মেনে চলে না। তাই কোনো তত্ত্ব ও পদ্ধতিই এখানে সেভাবে খাটে না। বর্তমান বাজারে প্রাইস ডিসকভারিংয়ের কোনো পদ্ধতিই বাস্তবে কাজ করে না। তাই উপরে প্রক্ষেপন করা মূল্যের সঙ্গে শেয়ারের প্রকৃত বাজার দরের কোনো সামঞ্জস্য থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। বরং গত ৩/৪ সপ্তাহে বাজারে যে গতি-প্রকৃতি দেখা গেছে, তাতে শেয়ারটি ফেয়ার প্রাইসের উপরেই কেনাবেচা হতে পারে।

গত ৩/৪ সপ্তাহ ধরে বাজারে তুলনামূলক নতুন কোম্পানির শেয়ারে বেশি ঝোঁক দেখা গেছে। বড় কিছু বিনিয়োগকারী কৌশলগত কারণে এসব কোম্পানির শেয়ার বেছে নিয়েছে। আর সেগুলোতে চলেছে প্লে করার চেষ্টা। কোনো কোনো কোম্পানির ক্ষেত্রে বেনামে স্পন্সরদের জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও উঠেছে। তেমনটি হলে কেপিপিএলের শেয়ারেরও যে কোনো মূল্য হতে পারে। এমনটি সেটি ৩৫/৪০ টাকায় চলে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

তবে বিনিয়োগকারীদের উচিত হবে, হুজুগ ও গুজবকে গুরুত্ব না দিয়ে সতর্কতার সঙ্গে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়া। এ ক্ষেত্রে অতীত অভিজ্ঞতাকেও বিবেচনায় রাখা ভালো। অনেকেরই হয়তো মনে পড়বে, নতুন কোম্পানির শেয়ার নিয়ে ২০১৪ সালে একবার প্লে হয়েছিল। আর ওই প্লের শেষভাগে যারা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করেছিলেন, তাদেরকে বিপুল লোকসানে পড়তে হয়েছে। সেবার আমরা টেকনোলজির শেয়ারের দাম উঠেছিল ৮০ টাকা। বর্তমানে এই শেয়ার ৩০/৩২ টাকা দরে কেনাবেচা হয়। তখন সায়হাম কটনের শেয়ারের দাম উঠেছিল ৪৫ টাকা। কিন্তু পরের দুই বছরে এটি কখনো ৩৫ টাকাই পার হতে পারেনি। বর্তমানে এই শেয়ারের দাম ২০ থেকে ২৫ টাকায় উঠা-নামা করে।