ডিএসসি বাড়ায় দৈনিক ‘লোকসান’ ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা

0
55
NCT CTG Port
চট্টগ্রাম বন্দর: ফাইল ছবি

পণ্যের ডেস্টিনেশন সার্ভিস চার্জ (ডিএসসি) ৭৫ শতাংশ বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশন (বাফা)। এতে পণ্যের পরিবহন খরচ বাড়ায় দৈনিক গড়ে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন চট্টগ্রাম বন্দর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

NCT CTG Port
চট্টগ্রাম বন্দর: ফাইল ছবি

তাদের অভিযোগ- চার্জ বাড়ানোর ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর ) এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা করেনি বাফা। এমনকি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মতামতও নেওয়া হয়নি। তবে বাফা বলছে, আইন লঙ্ঘন করা হয়নি। কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধি, দক্ষ লোকবল নিয়োগসহ নানা কারণে খরচ বেড়ে যাওয়ায় চার্জ বাড়ানোর বিকল্প ছিল না।

গত ১৬ জুলাই থেকে আমদানিকৃত পণ্যের প্রতি বিএল (বিল অব লেডিং) বাবদ ছাড়পত্র নেওয়ার ফি ২ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ৩ হাজার টাকা করেছে বাফা। এর আগে গত বছরের আগস্টে ডিএসসি চার্জ বৃদ্ধির বিষয়ে বাফার সিন্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন স্টকহোল্ডাররা। পরবর্তীতে এ নিয়ে বাফা-এনবিআর-চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের বৈঠক হয়। এসব বৈঠকে বাফাকে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে যৌক্তিকভাবে চার্জ আদায়ের পরামর্শ দেয় এনবিআর।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রিসহ একাধিক ব্যবসায়ী সংগঠনের পক্ষ থেকে এনবিআর ওচট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ করা হয়, বাফা একতরফাভাবে চার্জ বৃদ্ধি করায় ব্যবসায়ীদের দৈনিক আর্থিক ক্ষতি ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এর প্রভাব পড়ছে আমদানি-রপ্তানি পণ্যে।

এতে বলা হয়, চার্জ আদায়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা (আইসিসি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এসআরও ১৮/০৮ এর ২০(১) ধারা, কাস্টমস অ্যাক্ট-১৯৬৯ এর ২০৭ ধারা, বাংলাদেশ এফইআর অ্যাক্ট ১৯৪৭ এর ১৮/এ ধারা ও চট্টগ্রাম বন্দর অধ্যাদেশ ১৯৮৬ তে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারদের চার্জ আদায় নীতির লঙ্ঘন করেছে বাফা।

চট্টগ্রাম বন্দর অধ্যাদেশ ১৯৮৬ তে বলা হয়েছে, কন্টেইনার পণ্য পরিবহনের সব খরচ ভাড়ার সঙ্গে যুক্ত হবে। চালানের ক্ষেত্রে আমদানীকারক চালান পরিবহনকারীর স্থানীয় এজেন্টের কাছে কোনো চার্জ দেবেন না।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাফার পরিচালক খায়রুল আমিন সুজন দাবি করেন, আইন লঙ্ঘন করা হয়নি। বন্দর থেকে পণ্য খালাসের পূর্বে ছাড়পত্র নিতে একটা চার্জ দিতে হয়। এ ধরনের চার্জ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডাররা আদায় করেন। অথবা পণ্য ক্রয়ের সময় এলসির সঙ্গে চার্জ অন্তভুর্ক্ত হয়। সেক্ষেত্রে দ্বিগুণ অর্থ ব্যয় করতে হয় ব্যবসায়ীদের।

অন্যান্য দেশের কাস্টমসে এ ধরনের চার্জ আদায়ের প্রমাণ বাফার পক্ষ থেকে এনবিআরের কাছে পেশ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহ-সভাপতি এ.এম. মাহবুব চৌধুরী অর্থসূচককে বলেন, বাড়তি চার্জের বিষয়ে বাফাকে এনবিআর নিষেধাজ্ঞা দিলেও তা মানা হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনে ও চট্টগ্রাম বন্দর অধ্যাদেশ ১৯৮৬ অনুসারে, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডাররা কোনো চার্জ দাবি করতে পারেন না। চার্জ আদায়ের ক্ষেত্রে ইন্টারন্যাশল চেম্বার অফ কমার্সের (আইসিসি) নিয়মও অনুসরণ করেনি বাফা।

ব্যবসায়ীদের জিম্মি করতে এ ধরনের সিন্ধান্ত নেওয়া হয়েছে- অভিযোগ করে তিনি জানান, বাফার এই সিন্ধান্তের প্রতিবাদে এনবিআর, বন্দর ও কাস্টমসসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

বাফার পরিচালক খায়রুল আমিন সুজন বলেন, গত ৪ বছরে চার্জ না বাড়ালে আয়-ব্যয়ে সামঞ্জস্য থাকছে না। কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধি, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার, প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনার জন্য দক্ষ লোকবল নিয়োগসহ নানা কারণে খরচ বেড়ে যাওয়ায় চার্জ বৃদ্ধির বিকল্প ছিল না।

পুরো পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ী-কাস্টমস হাউস-এনবিআরের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, গত আগস্টে সিন্ধান্ত হয়েছিল সেপ্টেম্বরে চার্জ ২ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ হাজার টাকা করা হবে। এনবিআর ও কাস্টমসের অনুরোধে তা কয়েক দফা পেছানো হয়। চলতি বছরের ১৬ জুলাই থেকে বাড়তি অর্থ নেওয়া হচ্ছে।

খায়রুল আমিন সুজন বলেন, আমরা বিভিন্ন সময়ে এনবিআরকে চিঠি দেওয়ার পরও তারা মতামত দেয়নি। আমরা বিভিন্ন দেশের এ ধরনের চার্জ আদায়ের বিষয় ও চার্জের হার সম্পর্কিত তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেছি এনবিআরের কাছে। চার্জ আদায়ে এনবিআরের সিন্ধান্তের অপেক্ষার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

এনবিআরের আইন প্রসঙ্গে বাফা পরিচালক বলেন, এনবিআরের লাইসেন্স নিয়ে শিপিং এজেন্ট, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টসহ অনেক প্রতিষ্ঠানের মতো আমরাও ব্যবসা করছি। চার্জ আদায়ের ক্ষেত্রে এনবিআরের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

৭৫ শতাংশ চার্জ বৃদ্ধির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কেউ চাইলে এর চেয়ে কম চার্জ দিয়েও ছাড়পত্র নিতে পারে। সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ হাজার টাকা করা হয়েছে; যাতে কেউ ইচ্ছেমতো সার্ভিস চার্জ আদায় করতে না পারে।

জানা যায়, ২০০৮ সালে এই চার্জের হার ছিল আড়াই হাজার টাকা। সেনা সমর্থিত ১/১১ এর তত্ত্বাবধায়ক সরকার এ চার্জ কমিয়ে দেড় হাজার টাকা করেছিল। এক বছর পর তা বাড়িয়ে ২ হাজার টাকা করা হয়। গত বছরের আগস্টে চার্জ বাড়িয়ে সাড়ে ৩ হাজার টাকা করা হলে তা স্থগিতের নির্দেশ দেয় এনবিআর। গত ফেব্রুয়ারি থেকে বাড়তি চার্জ আদায়ে বাফার ঘোষণার পর ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে তা আদায় করা সম্ভব হয়নি।

গত ৩০ মার্চ পর্যন্ত এনবিআর ও কাস্টমস হাউসের সঙ্গে বাফার একাধিক বৈঠকেও এ বিষয়ে সিন্ধান্ত আসেনি। পরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে যৌক্তিকহারে চার্জ আদায়ের নির্দেশ দেয় এনবিআর। গত ২৫ জুন বাফার বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) সদস্যরা ১৬ জুন থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ হাজার টাকা চার্জ নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেন। গত ৩ জুলাই এনবিআর সদস্য মো. ফরিদ উদ্দিনকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি অবহিত করা হয় বলে দাবি করেন বাফা পরিচালক।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন কাস্টমস হাউজে গড়ে দেড় হাজার কন্টেইনার পণ্যের শুল্কায়ন (বিল অফ এন্ট্রি) হয়। এসব শুল্কায়নের পর বন্দর থেকে পণ্য খালাসের আগে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারদের কাছ থেকে ছাড়পত্র নিতে হয়। প্রতিটি বিএল-এর জন্য ২ হাজার টাকা থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত চার্জ দিতে হয়।

তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ-এর প্রথম সহ-সভাপতি নাসিরউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, গত সপ্তাহে এনবিআর চার্জ না বাড়ানোর নোটিস জারি করলেও ফ্রেইট ফরওয়ার্ডাররা তা মানছেন না। বাফার একতরফা সিদ্ধান্তে তৈরি পোশাক শিল্পে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে।

এর সমাধানে কাস্টম হাউস, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও এনবিআরকে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানিয়েছে বিজিএমইএ।

এমই/