অর্থ পাচারের তথ্য নেই বিএফআইইউ’র কাছে

উন্নয়নশীল দেশ থেকে অর্থ পাচার হয়, বাংলাদেশ  থেকেও অর্থপাচার হয়। এটি ফেরানো সম্ভব নয়। কোনো কোনো পণ্যে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত ওভার ইনভয়েসিং করে এ অর্থপাচার করা হয়। তবে কি পরিমাণ অর্থপাচার হয়েছে এমন কোনো তথ্য নেই বিএফআইইউ’র কাছে।

সোমবার (৩১ অক্টোবর) বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশিত অনুষ্ঠানে এমনটাই জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান মাসুদ বিশ্বাস।

মাসুদ বিশ্বাস বলেন,  দেশে থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থপাচার হয়ে থাকে ট্রেড বেসড মাধ্যমে। এছাড়া ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিং পন্থা অবলম্ব করেও করা হয়।

তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে পাওয়া গেছে, কোনো কোনো পণ্যের ক্ষেত্রে ২০ থেকে ২০০ শতাংশ ওভার ইনভয়েসিং হয়েছে। গত তিন মাস ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক এলসি খোলাতে নানা কড়াকড়ি আরোপ করার ফলে এখন ওভার ইনভেয়েসিং হচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, এখন আমাদের কাজ আন্ডার ইনভয়েসিং কিভাবে হচ্ছে তা খুঁজে বের করা। আমরা একটা জায়গা খুঁজে পেয়েছি, সেটা হচ্ছে গাড়ির ক্ষেত্রে। দেখাচ্ছে গাড়ির ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ ট্যাক্স রয়েছে। তাই আন্ডার ইনভয়েসিং করতে পারলে ট্যাক্সের পরিমাণ কমে যাবে। তাই এর মাধ্যমেই আন্ডার ইনভয়েসিং করার জন্য প্রধান জায়গা হিসেবে এটা বেছে নিয়েছে। এছাড়াও অন্যান্য জায়গাও আন্ডার ইনভয়েসিং করার সুযোগ রয়েছে। এসব জায়গায় বাংলাদেশ ব্যাংক মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করছে। আগামীতে এটাও কমে আসবে বলে আশাবাদী।

বিএফআইইউ প্রধান বলেন, দেশ থেকে অর্থপাচার হয় না, এটা বলা যাবে না। দেশ থেকে টাকা পাচার হয়। তবে যেটা একবার পাচার হয় সেটা ফেরানো সম্ভব হয় না। এছাড়া দেশ থেকে কি পরিমাণ অর্থপাচার হয়েছে, এমন কোনো তথ্যও বিএফআইইউ’র কাছে নেই।

তিনি আরও বলেন, প্রতিটা উন্নয়নশীল দেশ থেকেই অর্থপাচারের ঘটনা ঘটে। যেহেতু আমরা উন্নয়নশীল দেশ, সেক্ষেত্রে আমাদের এখান থেকেও হয়। এছাড়া অবৈধ অর্থ ছাড়াও বৈধভাবেও নানানভাবে দেশ থেকে টাকা চলে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, দেশে হুন্ডি হচ্ছে। তবে হুন্ডির ডলার কোথাও না কোথাও ব্যবহার হচ্ছে। আর তা ব্যবহার হচ্ছে আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের পেমেন্টে। বাংলাদেশ ব্যাংক যেহেতু মনিটরিং জোরদার করেছে, আশা করি আগামীতে ট্রেড বেসড মানি লন্ডারিং কমে আসবে।

সুইচ ব্যাংকের প্রসঙ্গে বলেন, সুইচ ব্যাংকে বাংলাদেশিদের টাকার পরিমাণ বেড়েছে, এমন তথ্য আমরা প্রায় সময় দেখি। এটা নিয়ে আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। সুইচ ব্যাংকে ব্যক্তি পর্যায় টাকা হলো ৩ শতাংশ, বাকিটা ব্যাংক টু ব্যাংক পর্যায়ে রয়েছে। সুইজারল্যান্ড থেকে আমরা কিছু তথ্য চেয়েছি, তারা আমাদের দিয়েছে। তবে এখন তারা আইন পরিবর্তন করেছে। আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে ব্যক্তি পর্যায়ের তথ্য শেয়ার করবে। এখন তথ্য চাইলে সুইচ এফআইইউর ভেতরে যে তথ্য আছে, সেটাই দিতে পারে।

বিএফআইইউর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের আর্থিক খাতে গত ২০২১-২২ অর্থবছরে ৮ হাজার ৫৭১টি সন্দেহজনক লেনদেন (এসটিআর) হয়েছে। এক বছরে সন্দেহজনক লেনদেন বেড়েছে ৬২ দশমিক ৩২ শতাংশ বা ৩ হাজার ২৯১টি। ২০২০-২১ অর্থবছরে এই সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ২৮০টি।

এর আগে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে এমন লেনদেন ও কার্যক্রম হয়েছিল ৩ হাজার ৬৭৫টি। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এমন লেনদেন ও কার্যক্রম হয়েছিল ৩ হাজার ৫৭৩টি।

সংবাদ সম্মেলনে মাসুদ বিশ্বাস বলেন, এসটিআর করলেই শাস্তি পেতে হবে, এমন কোনো বিষয় নেই। ব্যাংক থেকে কোনো লোন অস্তিত্বহীন জায়গা চলে যাবে, এমন তথ্য পেলে সেটা বিএফআইইউ ঠেকাতে পারে। এটার জন্য ল ইনফোর্সমেন্ট এজেন্সির কাছে যেতে হয় না। এমন অনেক এসটিআর যদি ঘটনা ঘটে যাওয়ার আগে পাওয়া যায়, তাহলে সেটা আটকানোর সুযোগ থাকে। আর যদি ঘটনা ঘটে যায়, তাহলে সেটা আটকানো সম্ভব হয় না। ইতিমধ্যে মানি লন্ডারিং অ্যাক্টের মাধ্যমে বেশ কিছু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করেছি। দায়ী কর্মকর্তাদের ওপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছি।

বিএফআইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়, পুরো অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৯৯৯টি সন্দেহজনক লেনদেনের রিপোর্ট জমা দিয়েছে ব্যাংকগুলো। তার আগের অর্থবছরে ৪ হাজার ৪৯৫টি রিপোর্ট জমা দিয়েছিল ব্যাংকগুলো। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো রিপোর্ট জমা দেয় ১০৬টি। আর এক্সচেঞ্জ হাউসগুলো ৪৫৭টি রিপোর্ট জমা দিয়েছে। এছাড়া ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সন্দেহজনক লেনদেন বেড়েছে। ৫২টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ওপর তদন্ত করে ৩৩টির সারাংশ আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে।

এ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র জি এম আবুল কালাম আজাদ, বিএফআইইউ পরিচালক রফিকুল ইসলাম, মো. আরিফুজ্জামান, অতিরিক্ত পরিচালক কামাল হোসাইন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

অর্থসূচক/এমএইচ/এমএস

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.