সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরো বাড়বে

বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও স্বল্প আয়ের মানুষেরা এমনিতেই ভোগান্তিতে পড়েছে। তার উপর আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশের বাজারে আরো এক দফা বাড়ানো হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরো বাড়বে। কেননা জ্বালানি তেলের এই বাড়তি দামে পরিবহন ব্যয় এবং দ্রব্যমূল্য আরো বাড়বে, যা সাধারণ মানুষের উপরেই এসে পড়বে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি দিয়েই চলতি বছর শুরু হয়েছিল। সরকারের প্রত্যক্ষ্য ও পরোক্ষ ভূমিকার অভাবে এরপর দিন যত এগিয়েছে, নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দামও ততো বেড়েছে। যদিও মানুষের আয় এসময় খুব বেশি বাড়েনি। ফলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশীয় বাজারেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরো বাড়বে বলে মনে করছেন তারা।

তাদের মতে, জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে বাড়বে পরিবহণ ব্যয় ও পণ্যের উৎপাদন খরচ। তবে এতে উদ্যোক্তা বা পরিবহণ মালিকদের কোনো ক্ষতি হবে না। তারা দাম বাড়িয়ে নিজেদের খরচ ঠিকই সমন্বয় করে নেবেন। ফলে শেষ পর্যন্ত জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির খেসারত সাধারণ মানুষ কিংবা ক্রেতা-ভোক্তাকেই দিতে হবে। তাদেরকে আনুপাতিক হারের চেয়েও বেশি দামে পণ্য কিনতে হবে এবং সেবা নিতে হবে, ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বাড়বে।

বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৮৫ থেকে ১০৫ টাকার সয়াবিন তেলের দাম কয়েক দফায় বাড়িয়ে প্রতি লিটার ১৬০ টাকায় নেয়া হয়। ৪০-৪৫ টাকার পেঁয়াজ ঠেকেছে ৮০ টাকায়। শীতকালীন কিংবা গ্রীষ্মকালীন কোন সবজিই কেজিপ্রতি ৮০ টাকার নিচে পাওয়া যায় নি। এছাড়া চাল, ডাল, আটাসহ জীবনধারণে প্রয়োজনীয় অন্যান্য পণ্য ও সেবার দামও দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে ডিজেল, ফার্নেস অয়েল ও কেরোসিনে দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দিল সরকার। অর্থাৎ তেলের দাম প্রতি লিটারে ২৩ শতাংশ হারে বাড়ানো হয়েছে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ১২ কেজির সিলিন্ডারের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম দুই দফায় ২৮০ টাকা বাড়ানো হয়।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের (ক্যাব) বার্ষিক প্রতিবেদন  অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং বিভিন্ন পণ্য ও সেবা-সার্ভিসের মূল্য বেড়েছে ৬ দশমিক ৩১ শতাংশ। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির এই হার ২০১৯ সালে ছিল ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং পণ্য ও সেবামূল্য বৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ০৮ শতাংশ। ২০১৮ সালে এই বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৬ দশমিক শূন্য শতাংশ ও ৫ দশমিক ১৯ শতাংশ। এর মানে গত তিন বছর ধরে দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা চলতি বছর (২০২১ সাল) আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে প্রতিবছরই বাড়ছে মূল্যস্ফীতির পরিমাণও। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ, যা আগস্টে ছিল ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এই সময় খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৫ দশমিক ২১ শতাংশ, যা আগস্টে ছিল ৫ দশমিক ১৬ শতাংশ। এ ছাড়া খাদ্য বর্হিভূত পণ্যেও মূল্যস্ফীতিও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ১৯ শতাংশে, যা তার আগের মাসে ছিল ৬ দশমিক ১৩ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে ক্যাব সভাপতি গোলাম রহমান অর্থসূচককে বলেন, ‘এমনিতেই দ্রব্যমূল্যের ঊধ্বগতিতে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হলো জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। গ্যাস, বিদ্যুৎ পানির মূল্যও দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে। সীমিত আয়ের মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য কেনাকাটার ভরসাস্থল টিসিবির পণ্যের দামও কিছুদিন আগে বাড়ানো হয়েছে। তার উপর ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়ানো ভোক্তা পর্যায়ে মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

তিনি বলেন, ‘বর্ধিত মূল্য বৃদ্ধির কারণে পণ্য পরিবহন ও যাতায়াত খাতে ব্যয় তো বাড়বেই। এছাড়া প্রতিটি পণ্য ও সেবার দাম বাড়িয়ে দিয়ে জনজীবনে মারাত্মক দুর্ভোগ সৃষ্টি করবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘সরকার সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে যুক্ত ডিজেল ও কেরোসিন তেলের দাম বাড়ালেও অকটেন ও পেট্রোলের দাম বাড়ায়নি। ফলে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ও সাধারণ ভোক্তাদের সঙ্গে ন্যায্য বিচার করেনি।’

একই প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একজন চাকরিজীবী বলেন, দ্রব্যমূল্যেও ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। অন্যসময় সরকারের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়ে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা হলেও এবার সরকার একেবারেই নিরব রয়েছে। সামনে নির্বাচন বলেই হয়তো সরকার ব্যবসায়ীদেও বিরুদ্ধে এখন কোন পদক্ষেপ নিতে চাচ্ছে না। উল্টো জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে সরকার। এতে পরিবহণ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরো বাড়বে।

অর্থসূচক/মৃত্তিকা সাহা/এমএস