সিএসআর নিয়ে প্রাইম ব্যাংকের তামাশা

শিক্ষার চেয়ে ক্রিকেট বড়!

0
101
Prime Bank
প্রাইম ব্যাংক লোগো
Prime Bank
প্রাইম ব্যাংক

কোম্পানি সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) তহবিল ব্যবহারে স্বেচ্ছাচারিতা করে চলেছে বেসরকারি প্রাইম ব্যাংক লিমিটেড। সিএসএআর-এর অর্থ সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠিকে সহায়তায় ব্যবহারের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা থাকলেও তার পরোয়া করছে না এ ব্যাংকটি। বরং নিজের ব্র্যান্ডিং আর প্রভাবশালী এক পরিচালককে বাড়তি সুবিধা দিতে অকাতরে অর্থ ব্যয় চলছে।

জানা গেছে, গত ৩ বছরে ক্রিকেট ক্লাব কেনা ও পরিচালনায় প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে প্রাইম ব্যাংক ও তার সহযোগী প্রাইম ব্যাংক ফাউন্ডেশন। এর মধ্যে ২০১৩ সালেই ব্যয় করেছে প্রায় ১১ কোটি টাকা। অর্থচ এ সময়ে শিক্ষা খাতে প্রতিষ্ঠানটি ব্যয় করেছে ৫ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য খাতে ৩ কোটি আর দুর্যোগ সহায়তা খাতে পৌনে ২ কোটি টাকা। দেশের অন্যতম শীর্ষ এই ব্যাংকের কাছে শিক্ষার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে ক্রিকেট। গত বছর সিএসআর খাতে মোট ব্যয়ের ৪৮ ভাগ গেছে ক্রিকেটের পেছনে; অথচ শিক্ষা খাতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৯ শতাংশ।

বর্তমানে ব্যাংকটি প্রাইম ব্যাংক ক্রিকেট ক্লাব পরিচালনা করছে। এ ক্লাবের পেছনে ব্যয় হচ্ছে বিপুল অর্থ। আর এর পুরো সুফল ভোগ করছেন ব্যাংকের প্রভাবশালী পরিচালক ও নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান তানজিল চৌধুরী। তাকে ক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আর এ সুবাদে তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন।

ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ক্রিকেটের পেছনে অর্থ ব্যয়কে তাদের ব্র্যান্ডিং হিসেবে দাবি করেছেন। তাছাড়া ক্রিকেটের মতো খেলাকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়াকে সামাজিক কাজ হিসেবেই দেখছেন প্রাইম ব্যাংক ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. ইকবাল আনোয়ার।

এদিকে ব্র্যান্ডিংয়ের নামে ক্রিকেটের পেছনে অর্থ ব্যয়ের বিষয়টিকে মোটেও সহজভাবে দেখছেন না পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রাইম ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডাররা। তাদের বক্তব্য, ক্রিকেটের নামে এত অর্থ ব্যয় বড় ধরনের ক্ষয়িষ্ণু ব্যাংকটির জন্য বিলাসিতা। কোনোভাবেই এটি মেনে নেওয়া যায় না।

উল্লেখ, গত চার বছর ধরে ব্যাংকটির ব্যবসা নিম্নমুখী। ২০০৯ সালের পর থেকে ক্রমাগত এই ব্যাংকের শেয়ার প্রতি আয় বা ইপিএস কমছে। ২০০৯ সালে ব্যাংকটির ইপিএস ছিল ৭ টাকা ৯৪ পয়সা। পরের বছর তা কম হয় ৬ টাকা ৯০ পয়সা। ২০১১ সালে ইপিএস নেমে আসে ৪ টাকা ৭৭ পয়সা, ২০১২ সালে হয় ২ টাকা ৮৯ পয়সা। গত বছর ব্যাংকটির ইপিএস আরও কমে ১ টাকা ৯৮ পয়সা হয়।

 সিএসআর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে কোনো গাইডলাইন না থাকার সুযোগের পুরো অপব্যাহার করে চলেছে প্রাইম ব্যাংক। এমটি মনে করছে বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট বিভাগ। তারপরও তারা ব্যাংকটির কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইবে বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, ২০১১ সালে প্রাইম ব্যাংক ফাউন্ডেশন প্রায় ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকায় ওল্ড ডিওএইচএস ক্লাব কিনে নেয়। ক্লাব ক্রিকেটের পরবর্তী তিন আসরে (২০১১, ২০১২ ও ২০১৩) দল গঠন ও আনুষঙ্গিক কাজে ব্যয় করা হয় আরও প্রায় ১৫ কোটি টাকা। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) টাইটেল স্পন্সর কিনতে ৬ কোটি টাকার চুক্তি করে প্রাইম ব্যাংক। এর পর বিসিবির আয়োজনে প্রথমবারের মতো আয়োজিত ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক ক্রিকেট লিগ বিসিএলে ৬০ লাখ টাকায় সাউথ জোন কিনে নেয় প্রাইম ব্যাংক। পরে দুই আসরে এর পেছনে ব্যয় হয় প্রায় ৩ কোটি টাকা। আম্বর বিজয় দিবস টি২০ টুর্নামেন্টেও অর্থ ব্যয় করে ব্যাংকটি। পাশাপাশি প্রাইম ব্যাংক ক্রিকেট ক্লাবের কোচ হিসেবে খালেদ মাহমুদ সুজন ও ওল্ড ডিওএইচএসের ক্রিকেট কমিটির সাবেক ম্যানেজার ও বর্তমানে প্রাইম ব্যাংক ক্রিকেট ক্লাবের সহকারী ম্যানেজার সাইফুল ইসলামও প্রতি মাসে পারিশ্রমিক নিচ্ছেন ব্যাংক থেকে। এভাবে গত তিন বছরে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে ব্যাংকটি, যা যাচ্ছে সিএসআরের অর্থে পরিচালিত প্রাইম ব্যাংক ফাউন্ডেশন থেকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, তফসিলভুক্ত সব ব্যাংক ও ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান মোট ৫টি ক্যাটাগরিতে সিএসআর-এর অর্থ ব্যয় করতে পারবে। এর মধ্যে শুধু শিক্ষাখাতে ব্যয় করতে হবে মোট সিএসআর খাতে ব্যয় করা অর্থের ৩০ শতাংশ। আর সিএসআর কার্যক্রমের অর্থ দেশের পিছিয়ে পড়া অসহায় মানুষের কল্যাণে ব্যয় করারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নির্দেশনায়।

কিন্তু প্রাইম ব্যাংক ২০১৩ সালের সিএসআর কার্যক্রমের যে প্রতিবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিয়েছে তাতে দেখা গেছে ব্যাংকটি গত বছর মোট সিএসআর খাতে ব্যয় করেছে ২৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এর মধ্যে তারা শিক্ষা খাতে ব্যয় করেছে ৫ কোটি ৯২ লাখ টাকা। শতকরা হিসাবে যা মোট খরচের ২৩ শতাংশ। অথচ ব্যাংকটি ওই বছর খেলাধুলায় ব্যয় করেছে প্রায় ১১ কোটি টাকা। যা মোট সিএসআর ব্যয়ের ৪৭ শতাংশের বেশি। আর এর পুরোটায় ব্যাংকটি ব্যয় করেছে নিজস্ব ক্রিকেট প্রতিষ্ঠানের নামে।

এভাবে নিজস্ব বা যে কোনো ক্লাবের নামে টাকা খরচ সিএসআর-এর মধ্যে পড়বে না বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ব্যাংকিং ও সিএসআর বিভাগের কর্মকর্তারা। তারা অর্থসূচককে বলেন, কোনো ফাইন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করা হয় মূলত গরীব, দুঃস্থ, অসহায় ও সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষকে সাহায্য করার জন্য। এ ফাউন্ডেশনের ব্যয়ই মূলত সিএসআর ব্যয়। ফাউন্ডেশনের অর্থ অন্যখাতে ব্যয় করা সম্পূর্ণ অনৈতিক ও সিএসআর নীতিমালা বহির্ভূত বলে জানান তারা।

তারা আরও জানান, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে সিএসআর-এর নির্দেশনা দেওয়া হলেও এখনও কোন নীতিমালা প্রকাশ করা হয়নি। এ কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে খুশি টাকা খরচ করে সিএসআর হিসেবে দেখাচ্ছে। সিএসআর নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে বলে জানান তারা। আগামি সপ্তাহেই এ নীতিমালা চুড়ান্ত অনুমোদন পাবে। আর এ নীতিমালা জারি করা হলে সিএসআর ব্যয় নিয়ে আর কোন সমস্যা থাকবে না বলে মনে করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসব কর্মকর্তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই বিভাগের এক কর্মকর্তা অর্থসূচককে বলেন, খুব শিঘ্রই প্রাইম ব্যাংকের কাছে তাদের গত কয়েক বছরের সিএসআর ব্যয়ের হিসাব চাওয়া হবে। তাদের এ হিসাব যাচাই বাছাই করে ব্যাংকটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

এ ব্যাপারে সিএসআর নীতিমালা না থাকাকেই দায়ী করেছে প্রাইম ব্যাংক। ব্যাংকটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুধু সিএসআর-এর ৫টি খাত নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু কোন খাতের কোন অংশে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে তা নির্দিষ্ট করে কিছু বলেনি। ফলে প্রাইম ব্যাংক শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্যোগের পাশাপাশি খেলাধুলাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। খেলাধুলার প্রসার ঘটলে সমাজের পিছিয়ে পড়া একটা অংশ ভাল খেলোয়াড় হওয়ার সুযোগ পাবে বলে মনে করে তারা। তবে সিএসআর নীতিমালা হলে সে নীতিমালাই পুরোপুরি অনুসরণ করে এ খাতে ব্যয় করা হবে বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

এসএই/