মহাজোটের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় ১৬ বিমা কোম্পানি

idra organogram

IDRA-27.05.12মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আশার পর ১৬ নতুন বিমা কোম্পানির লাইসেন্স দিয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি জীবন বিমা কোম্পানি ও দুটি সাধারণ বিমা (নন-লাইফ) কোম্পানি। এসব বিমার বেশির ভাগই দেওয়া হয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়, সরকারদলীয় নেতা-সমর্থকদের নামে। বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) চলতি বছরের জুলাই মাসে ১১টি  বিমা কোম্পানির লাইসেন্স দেয়। আবারও বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দফায় পাঁচটি কোম্পানির লাইসেন্স দেওয়া হয়। নতুন লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের বর্তমান মন্ত্রী, সাবেক মন্ত্রী, আঞ্চলিক ও বিদেশ শাখার নেতা ও সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের।

প্রথম দফায় লাইসেন্স দেওয়া ১১টি কোম্পানি: প্রথম দফায় লাইসেন্স দেওয়া হয় ১১ কোম্পানিকে তার মধ্যে নয়টি জীবন বিমা ও দুটি সাধারণ বিমা (নন-লাইফ) কোম্পানি।

প্রথম দফায় লাইসেন্স পাওয়া সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির অন্যতম উদ্যোক্তা রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক। নতুন লাইসেন্স পাওয়া এই কোম্পানিতে রূপালী ইনস্যুরেন্সেরও মালিকানা রয়েছে।
চার্টার্ড লাইফ ইনস্যুরেন্সের উদ্যোক্তাদের মধ্যে আছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ। ইউনিক হোটেলের প্রতিনিধি হিসেবে এই বিমা কোম্পানিতে আরও আছেন ব্যবসায়ী নূর আলী।
আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত আসনের সাংসদ ফরিদুন্নাহার লাইলী পেয়েছেন জেনিথ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের লাইসেন্স। চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের নেতা এম. নাসির উদ্দিন নতুন অনুমোদন পাওয়া মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের অন্যতম উদ্যোক্তা। গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্সের উদ্যোক্তারা হচ্ছে ব্র্যাক ফাউন্ডেশন, আয়েশা আবেদ ফাউন্ডেশন, স্কয়ার গ্রুপ এবং এপেক্স গ্রুপ। পরিচালক হিসেবে রয়েছে সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর ও স্যামুয়েল এইচ চৌধুরীর নাম।
বেস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্সের উদ্যোক্তা মেজর জেনারেল (অব.) হাফিজ মল্লিক। মোশাররফ হোসেন নামক একজন হিসাববিজ্ঞানী এই কোম্পানির পরিচালক। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে আইডিআরএ জেনেছে তিনি একজন ঋণখেলাপি।
প্রটেকটিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের অন্যতম উদ্যোক্তা আওয়ামী লীগের নেতা সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রফিকুল ইসলাম। পরিচালক রয়েছেন চট্টগ্রামভিত্তিক ক্রিস্টাল গ্রুপের মালিক ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি মোরশেদ মোরাদ ইব্রাহীমের ভাই রাশেদ মোরাদ ইব্রাহীম এবং ফুটবল ও ক্রিকেটের ধারাভাষ্যকার চৌধুরী জাফরুল্লাহ শরাফত।
জাপানি কোম্পানি তাইও এবং স্থানীয় সামিট গ্রুপকে যৌথভাবে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে তাইও-সামিট ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি নামে। সামিট গ্রুপের তিনটি প্রতিষ্ঠান এবং এশিয়ান ফার্নিচারের মালিকানা রয়েছে এতে।
এনআরবি গ্লোবাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে কানাডা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল আহাদকে। এতে পরিচালক রয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতা মোস্তফা আজাদ চৌধুরী ও গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহফুজুল বারী চৌধুরী।
নতুন অনুমোদন পাওয়া দুটি সাধারণ বিমা কোম্পানির মধ্যে একটিতে মালিকানা রয়েছে শিকদার গ্রুপের। মমতাজুল হক শিকদার ও জয়নুল হক শিকদারের পাশাপাশি মিরপুরের সাংসদ আসলামুল হক এবং মেজর জেনারেল (অব.) বিজয় কুমার সরকার এই কোম্পানির পরিচালক হিসেবে রয়েছেন।
অন্যটি হচ্ছে সেনাকল্যাণ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি। দেশে এর আগে বেসরকারি পর্যায়ে  ৪২টি সাধারণ বিমা কোম্পানি ছিল। জীবনবিমা কোম্পানি ছিল ১৭টি। মেটলাইফ অ্যালিকো নামে রয়েছে একটি বিদেশি জীবন বিমা কোম্পানি। এর বাইরে সরকারি সংস্থা রয়েছে দুটি—সাধারণ বীমা করপোরেশন ও জীবন বীমা করপোরেশন।

দ্বিতীয় দফায় লাইসেন্স পাওয়া পাঁচ বিমা কোম্পানি: দ্বিতীয় দফায় লাইসেন্স পাওয়া পাঁচটি কোম্পানি হলো- আলফা ইসলামী লাইফ, স্বদেশ লাইফ ইনস্যুরেন্স, ট্রাস্ট ইসলামী লাইফ, যমুনা লাইফ ইনস্যুরেন্স ও ডায়মন্ড লাইফ ইনস্যুরেন্স।

তালিকা অনুযায়ী, রাজশাহী-৬ আসনের সাংসদ শাহরিয়ার আলম সুপারিশে আলফা ইসলামী লাইফের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। আর কর্ণধার হলো তৈরি পোশাক ব্যবসায়ীর নাজিমউদ্দিন আহমেদ । আর স্বদেশ লাইফের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্রের সভাপতি নুরুল আলম চৌধুরীকে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফের সুপারিশে ট্রাস্ট ইসলামী লাইফের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী আওয়ামী লীগের নেতা জাকের আহমেদ ভূঁইয়াকে। আর যমুনা লাইফ ইনস্যুরেন্সের জন্য সুপারিশ করেছেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের ছেলে ভৈরবের সাংসদ নাজমুল হাসান। এটি দেওয়া হয়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চলের আওয়ামী লীগের সাংসদ মোশাররফ হোসেন। এ ছাড়াও ডায়মন্ড লাইফ ইনস্যুরেন্সের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইসহাক আলী খান পান্নাকে।

প্রসঙ্গত, আগে ৪২টি সাধারণ বিমা, ১৭টি জীবন বিমা ও একটি বিদেশি জীবন বিমা মেটলাইফ অ্যালিকো এবং সরকারি সংস্থা সাধারণ বিমা করপোরেশন ও জীবন বিমা করপোরেশন নিয়ে ছিল দেশের বিমা খাত। নতুন লাইসেন্স পাওয়া ১৬ কোম্পানি সহ বর্তমানে মোট সংখ্যা হলো ৭৮টি।

দেশে আর কোনো বিমা কোম্পানির লাইসেন্স দেওয়ার বাস্তবতা রয়েছে কি না, আইডিআরএর চেয়ারম্যান এম শেফাক আহমেদের কাছে গত বছর তাঁর একটি বিশ্লেষণমূলক সমীক্ষা চেয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। শেফাক আহমেদ বিশ্লেষণ করে অর্থমন্ত্রীকে তখন জানিয়েও দিয়েছিলেন, আর বড়জোর দুই থেকে তিনটি জীবনবিমা কোম্পানির লাইসেন্স দেওয়া যেতে পারে। তবে কোনোভাবেই সাধারণ বিমা কোম্পানি নয়।
আইডিআরএ সূত্রে জানা যায়, এর পর নতুন করে বিমা কোম্পানি অনুমোদন দেওয়ার উদ্দেশে গত ১০ ফেব্রুয়ারি বিমাকারির নিবন্ধন প্রবিধানমালা-২০১৩ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।

গেজেট প্রকাশের পর ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত নতুন বিমা কোম্পানির নিবন্ধনের জন্য আইডিআরএ’র পক্ষ থেকে আবেদনপত্র চাওয়া হয়। এরপর পরবর্তীতে তিন দফা সময় বাড়িয়ে ১৫ মে পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়।

এই সময়ের মধ্যে মোট ৭৭টি আবেদন জমা পড়ে। আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে গত ৪ জুলাই আইডিআরএ প্রাথমিকভাবে ১১টি নতুন বিমা কোম্পানির অনুমোদন দেয়। এরমধ্যে ৯টি জীবন বিমা ও ২টি সাধারণ বিমা কোম্পানি।

এর পর থেকেই বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) বরাবরই নতুন বিমার লাইসেন্স দেওয়ার জন্য আইডিআরকে অনুরোধ করে আসছিলি। কিন্তু তাদের কথাকে উপেক্ষা করে তারা সরকারের নির্দেশে প্রথম দফায় ১১টি কোম্পানির লাইসেন্স দেয়। দ্বিতীয় দফায় লাইসেন্স দেওয়া হলো আরও পাঁচটি কোম্পানিকে।