লা মেরিডিয়ানকে পুঁজিবাজারে আনতে ডিএসই’র জালিয়াতি

0
480

পুঁজিবাজারের প্রাইমারি রেগুলেটর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বিরুদ্ধে এক অভিনব জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হোটেল লা মেরিডিয়ান এর স্বত্তাধিকারী প্রতিষ্ঠান বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেডকে সরকারি প্রতিষ্ঠান সাজিয়ে সরাসরি তালিকাভুক্ত (Direct Listing) করার উদ্যোগ নিয়েছিল।

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) অন্ধকারে রেখে অবৈধ এই কাজটি সেরে নেওয়ার সব আয়োজন চূড়ান্ত হয়েছিল। আজ বৃহস্পতিবার (১৭ ডিসেম্বর) অনুষ্ঠেয় ডিএসইর পরিচালনা পরিষদের সভায় কোম্পানিটিকে তালিকাভুক্ত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু গোপন সূত্রে এই তথ্য জানতে পেরে বিএসইসি দ্রুত বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করে। গতকাল বুধবার বিজয় দিবসের ছুটির দিনে জরুরি কমিশন বৈঠক ডেকে ডিএসইকে এই প্রক্রিয়া থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় তারা।

উল্লেখ, সরাসরি তালিকাভুক্ত হচ্ছে কোম্পানি তালিকাভুক্ত করার একটি বিশেষ পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি নতুন শেয়ার ইস্যু না করে উদ্যোক্তাদের কাছে থাকা শেয়ারের একাংশ বিক্রি করা হয়। আর বিক্রির শেয়ারের টাকা কোম্পানির হিসাবে জমা না হয়ে সরাসরি উদ্যোক্তাদের পকেটে চলে যায়।

২০০৯ ও ১০ সালে নাভানা সিএনজি, এসিআই ফরমুলেশন, খুলনা পাওয়ার কোম্পানি (কেপিসিএল)সহ কয়েকটি কোম্পানির উদ্যোক্তারা সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ নিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয়। ২০১০ সালের ধসের পর থেকে তাই সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ বন্ধ রাখে বিএসইসি। ২০১৫ সালে তালিকাভুক্তি বিধিমালায় সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ রাখা হলেও ২০১৬ সালে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বেসরকারি কোম্পানির জন্য এ সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

বেসরকারি কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তি বন্ধ থাকায় বেসরকারি বেস্ট হোল্ডিংসকে সরকারি প্রতিষ্ঠান সাজিয়ে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেয় ডিএসই। কোম্পানিতে থাকা কয়েকটি সরকারি ব্যাংকের বিনিয়োগের সুবাদে বেস্ট হোল্ডিংসকে সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়।

নির্বিঘ্নে জালিয়াতির কাজটি সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আশ্রয় নেওয়া হয় নানা কারসাজির। ডিএসইর সাবেক এক প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে ম্যানেজমেন্টের একটি অংশের যোগসাজসে অতি সূক্ষভাবে এই কারসাজির ছক সাজানো হয়।

ডিএসইর পরিচালনা পরিষদের সব সদস্য যাতে আগে থেকে বিষয়টি জানতে না পারে সে লক্ষ্যে বেস্ট হোল্ডিংসকে তালিকাভুক্ত করার বিষয়টি পর্ষদ সভার মূল আলোচ্যসূচির বাইরে রাখা হয়। পরে অতিরিক্ত আলোচ্যসূচিতে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে বুধবার সরকারি ছুটির দিনে পর্ষদ সদস্যদের কাছে ই-মেইল পাঠানো হয়।

বিএসইসির সূত্র মতে, ডিএসইর ২০১৫ সালের লিস্টিং রুলসে ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে সব কোম্পানির শেয়ার অফলোড করার সুযোগ রাখা ছিল।তবে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড কমিশন (বিএসইসি) ২০১৬ সালের ১ ডিসেম্বর নির্দেশনার মাধ্যমে সরকারি কোম্পানি ছাড়া অন্যসব ক্ষেত্রে ডাইরেক্ট লিস্টিং নিষিদ্ধ করা হয়।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার সেই আইনের ফাঁকফোকর খুঁজে বের করে বেসরকারি লা মেরিডিয়ান হোটেলকে সরকারি মালিকানার কোম্পানি বানিয়ে তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নিয়েছিলেন ডিএসইর পরিচালকদের একটি গ্রুপ।সঙ্গে রয়েছে ডিএসইর উধ্বতণ কর্মকর্তারাও। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে বিএসইসির নজরে আসার পরপরও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রাথম দফায় ডিএসইকে শোকজ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে কমিশনের নির্বাহী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব ও মুখপাত্র) মোহাম্মদ রেজাউল করিম অর্থসূচককে বলেন, নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও বেসরকারি একটি কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাভুক্তির চেষ্টার কথা জানতে ছুটির মধ্যেই জরুরি নির্দেশনা দিয়ে ডিএসইর পর্ষদ সভায় কোম্পানিটির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ডিএসইর কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা তলব করা হয়।

হোটেল লা মেরিডিয়ান প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার মূলধন সংগ্রহ করে। রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও রূপালী ব্যাংকও রয়েছে এই তালিকায়। ব্যাংকগুলো প্রাইভেট প্লেসমেন্টে ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ার ৬৫ টাকা দরে কিনেছে।

কোম্পানিটিতে বিভিন্ন ব্যক্তির মালিকানা ৫২.০১ শতাংশ। এছাড়া ৪৭.৯৯ শতাংশ মালিকানা রয়েছে প্লেসমেন্ট শেয়ারহোল্ডারদের। এরমধ্যে সরকারি ৪ ব্যাংকের মালিকানা ২৯.৫৮ শতাংশ (সোনালি ব্যাংকের ৮.৮৩%, জনতা ব্যাংকের ৮.৮৩%, অগ্রণী ব্যাংকের ৬.৬২% ও রূপালি ব্যাংকের ৫.৩০%)।

মূলত: প্লেসমেন্টহোল্ডারদের চক্রটিকে সুযোগ দেওয়ার লক্ষ্যেই ডিএসইর আলোচিত পরিচালকের নেতৃত্বে একটি চক্র ওই জালিয়াতির ঘটনাটি ঘটিয়েছে।