ঋণ করে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ না করাই উত্তম

0
242

রাতারাতি সম্পদশালী হওয়ার লোভে ২০১০ সাল থেকে ঋণ নিয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে অনেক বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অল্প সময়ে ধনী হওয়ার পরিবর্তে নিজের সব পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পথে পথে ঘুরছেন।

নিয়মের মধ্যে কিংবা নিয়মের বাইরে গিয়ে মার্জিন ঋণ দিয়ে বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি মার্চেন্ট ব্যাংক এবং কিছু ব্রোকারেজ হাউজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত ১০ বছরেও এই ব্রোকারেজ হাউজ এবং মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো তাদের এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

বরং সর্বশেষ তথ্য মতে, মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো এখনো সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা নেগেটিভ ইক্যুইটিতে রয়েছে। অর্থাৎ মার্জিন ঋণ দিয়ে অর্থ ফেরত পায়নি। এই অবস্থায় নতুন করে যেসব ব্রোকারেজ হাউজ মার্জিন ঋণ দেবে, আর যেসব বিনিয়োগকারী অতি লোভে ঋণ নেবেন উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্রোকারেজ হাউজগুলো আইনের মধ্যে থেকে বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রি করে তাদের অর্থ উত্তোলন করতে পারবে। কিন্তু দিন শেষে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন শুধু বিনিয়োগকারীরা। তাই ঊর্ধ্বমুখী বাজারে ঋণ করে বিনিয়োগ না করারই উত্তম বলে মনে করেন পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা।

ঋণ নিয়ে পুঁজিবাজারে বিনিযোগ করলে কেনা-বেচা হবে। আর তাতে মুনাফা পাবে ব্রোকার হাউজ কিংবা মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো। তারপরও ঊর্ধ্বমুখী পুঁজিবাজারে ঋণ করে বিনিয়োগ না করার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশে মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সভাপতি ছায়েদুর রহমান। এ বিষয়ে তিনি অর্থসূচককে বলেন, পুঁজিাবাজরে বিনিয়োগের জন্য মার্জিন ঋণ করা ঠিক না। কারণ পুঁজিবাজারে আজকে উত্থান, কাল পতন হচ্ছে। অর্থাৎ ক্ষণে ক্ষণে অবস্থার পরিবর্তন হয়। এই অবস্থায় বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগকারীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

ছায়েদুর রহমান বলেন, ঋণ করে পুঁজিবাজারে আসা উচিৎ না। তবে লাভ হবেই জেনে কেউ যদি অল্প সময়ের জন্য বিনিয়োগ করেন, করতে পারেন। কিন্তু ৩, ৬ মাস কিংবা ১বছর বা তার অধিক সময়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে জন্য মার্জিন ঋণ নিয়ে ব্যবসা করা ঠিক না।

মার্জিন ঋণ পুঁজিবাজারের বড় ব্যাধি (ক্যান্সার) বলে মনে করেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক মো. সাইফুর রহমান। এই ব্যাধি পুঁজিবাজারের সব শ্রেণীর লোকদের অনেক কষ্ট দিয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।

সাইফুর রহমান বলেন, মার্জিন ঋণ পুঁজিবাজারের জন্য বড় ব্যাধি। ২০১০ সালের বাজার ধসের কয়েকটি কারণের মধ্যে এটি ছিল অন্যতম। এক সময় মার্জিন ঋণের পরিমাণ ১ অনুপাত ২ থাকলেও বর্তমানে ১ অনুপাত শুন্য দশমিক ৫ নির্ধারণ করেছে কমিশন।

বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম অর্থসূচককে বলেন, আইনের মধ্যে থেকে বিনিয়োগকারীরা যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন। তবে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করা কখনোই ভালো না। এতে ব্যক্তির উপর ঋণের ঝুঁকি বাড়ে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ সিকউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, মার্জিন ঋণ কখনো সুখকর নয়। ঝুঁকিপূর্ণ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য মার্জিন ঋণ নেওয়া মানেই বিপদ ডেকে আনা। সুতরাং যতদূর কম মার্জিন ঋণ দিতে হবে। ঋণ নিতে হলে কোম্পানির পর্যালোচনা করে ইপিএস, এনএভিপিএস এবং কোম্পানির ভবিষৎ দেখতে হবে।

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি শরীফ আনোয়ার হোসেন বলেন, মার্জিন ঋণ নেওয়ার কিংবা দেওয়ার আগে কোন কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করবে তা বুঝে-শুনে দেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সব ধরনের নিয়ম কানুন মেনে ঋণ দিতে হবে, নিতেও হবে। যারাই নিয়মের ব্যত্যয় করবে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

ডিএসইর পরিচালক রকিবুর রহমান বলেন, উচ্চ দামে থাকা কোম্পানির শেয়ারে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করা ঠিক না। তারপও কেউ যদি ঋণ নিতে চায় তবে কোম্পানির ফান্ডামেন্টগুলো দেখে পিই রেশিও যাচাই বাছায় করে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে হবে। তা না হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেই।

উল্লেখ, মার্জিন অ্যাকাউন্ট হচ্ছে একটি ব্রোকারেজ অ্যাকাউন্ট যা কাস্টমারকে সিকিউরিটি ক্রয়ের জন্য লিভারেজ ব্যবহারের সুযোগ প্রদান করে থাকে। এরমানে হচ্ছে যে অ্যাকাউন্ট হোল্ডার বিনিয়োগ করার জন্য ব্রোকারের কাছ থেকে ঋণ নিতে পারবে। মার্জিনের নিয়ম সরকারিভাবে নিয়ন্ত্রিত, কিন্তু ব্রোকার এবং ডিলারের মধ্যে আবশ্যক মার্জিন এবং ইন্টারেস্টে পার্থক্য হতে পারে।

মার্জিন ঋণের নির্দেশনা
গত ২১ সেপ্টেম্বর বিএসইসি মার্জিন ঋণের নির্দেশনায় বলেছে, ডিএসই-এক্স সূচক ৪ হাজারের নিচে থাকাকালীন ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংক গ্রাহকদের সর্বোচ্চ ১:১ হারে মার্জিন ঋণ দিতে পারবে। তবে ২৮ সেপ্টেম্বরের নতুন নির্দেশনায় এই অনুপাত পরিবর্তন করে ১:০.৭৫ করা হয়েছে। অর্থাৎ গ্রাহকের নিজস্ব ১ টাকার বিনিয়োগের বিপরীতে সর্বোচ্চ ০.৭৫ টাকা মার্জিন ঋণ দেওয়া যাবে।

এদিকে নতুন নির্দেশনায় ৪০০১-৭০০০ পর্যন্ত সূচকের ক্ষেত্রে ১:০.৫০ হারে এবং ৭০০০ এর উপরে সূচকের ক্ষেত্রে ১:০.২৫ হারে মার্জিন ঋণ দিতে পারবে বলে বলা হয়েছে।

বিএসইসির এই নতুন নির্দেশনা আগামী বছরের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে।

এর আগের নির্দেশনায় ৪০০১-৫০০০ পর্যন্ত সূচকের ক্ষেত্রে ১:০.৭৫ হারে, ৫০০১-৬০০০ পর্যন্ত সূচকের ক্ষেত্রে ১:০.৫০ হারে এবং ৬০০০ এর উপরে সূচকের ক্ষেত্রে ১:০.২৫ হারে মার্জিন ঋণ দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। যা ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল।

উল্লেখ্য, বর্তমানে মার্জিন ঋণ প্রদানের সর্বোচ্চ হার ১:০.৫০ এবং সবক্ষেত্রে একই। অর্থাৎ গ্রাহকের নিজস্ব ১ টাকার বিনিয়োগের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৫০ পয়সা মার্জিন ঋণ দেওয়া যায়।

মার্জিন অ্যাকাউন্টের ব্যাখ্যা
বেশিরভাগ ব্রোকার মার্জিন অ্যাকাউন্ট সেটআপ করার সুযোগ প্রদান করে থাকে এবং আপনাকে অনেক ক্রয়ক্ষমতা প্রদান করতে পারে যার মাধ্যমে ট্রেডারের পক্ষ হতে খুব বেশি অর্থ বিনিয়োগের আবশ্যকতা থাকে না।

বিষয়টি এমন যে একজন বিনিয়োগকারী ৫০ ইউএস ডলার (ইউএসডি) দিয়ে স্টকের শেয়ার ক্রয় করলেন, যারফলে স্টকের মার্কেট প্রাইস ৭৫ ইউএসডিতে গেল। এরজন্য তিনি যদি নগদ অর্থ প্রদান করে থাকেন, তাহলে তার বিনিয়োগের রিটার্ন হচ্ছে ৫০ শতাংশ, যা ভালো পরিমানের লাভ। কিন্তু, তিনি যদি ২৫ ইউএসডি নগদ অর্থ প্রদান করে থাকেন এবং ২৫ ইউএসডি অর্থ মার্জিন হিসেবে ধার নিয়ে থাকেন, তাহলে তার রিটার্ন হচ্ছে ১০০ শতাংশ। তাকে এখনো ধার করা অর্থ ফেরত দিতে হবে, কিন্তু কয়েকটি ক্রয়ের মাধ্যমে ধারকৃত মার্জিনকে ছড়িয়ে, তিনি তার লাভ বাড়াবেন, যতক্ষণ পর্যন্ত স্টকের প্রাইস উপরে যেতে থাকবে।

মার্জিন অ্যাকাউন্টের সুবিধা ও অসুবিধা
মার্জিন অ্যাকাউন্ট ব্রোকার কতৃক অফার করা হয় যার মাধ্যমে বিনিয়োগকারী সিকিউরিটি ক্রয়ের জন্য ঋণ নিতে পারেন। একজন বিনিয়োগকারী হয়তো ক্রয় মূল্যের ৫০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারেন এবং বাকিটা ব্রোকারের কাছ থেকে ধার নিতে পারেন। ঋণের অধিকারের জন্য ব্রোকার বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে ইন্টেরেস্ট ধার্য করতে পারে এবং সিকিউরিটিকে জামানত হিসেবে রাখতে পারে। কিন্তু, ভোলাটাইল মার্কেটে ব্রোকার আবার অ্যাকাউন্টের ভ্যালু ক্লোজের সময় গণনা করতে পারে এবং তারপর পরবর্তী দিনগুলোতে রিয়েল-টাইমের ভিত্তিতে কল গণনা করতে পারে। সঠিক পরিস্থিতিতে মার্জিন ঋণ অনেক বড় মূল্যবান ট্যুল হতে পারে, কিন্তু সতর্ক থাকবেন যে এটা আপনার লাভ ও ক্ষতি দুটোই বাড়িয়ে দিতে পারে।

যখন আপনার অ্যাকাউন্টের ইক্যুইটি কমে যাবে এবং ব্রোকার নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণ মার্জিন সীমার নিচে চলে যাবে, তাদের ‘মার্জিন কল’ জারি করার অধিকার থাকে। মার্জিন কল বলে যে আপনার ব্রোকার হয় আপনার পজিশন আপনার সম্মতি ছাড়াই সেল করে দিতে পারে যাতে তারা তাদের বিনিয়োগের ঝুঁকি ফেরত পেতে পারে। অথবা তারা আপনাকে আপনার অ্যাকাউন্টে আরও মূলধন বিনিয়োগ করতে বলতে পারে যাতে আপনি আপনার রক্ষণাবেক্ষণ মার্জিনের সীমার ওপর ফেরত আসতে পারেন।

মার্জিনে বাই করাটা সাধারণত শর্ট-টার্মে বিনিয়োগের জন্য ব্যবহার করা হয় ইন্টারেস্ট চার্জের কারণে। মার্জিন ভালোভাবে কাজ করে যখন বিনিয়োগের মূল্য বাড়তে থাকে, কিন্তু যখন মূল্য কমতে থাকে তখন অসমর্থ হতে পারে।

মার্জিন অ্যাকাউন্টে ফেডারেল আইন
ফেডারেল রিজার্ভ ধারকৃত অর্থের ওপর সীমাবদ্ধতা রেখেছে যেখানে আপনি ক্রয়ের ভ্যালুর ৫০ শতাংশ মার্জিন ঋণ নিতে পারেন। মার্জিন অ্যাকাউন্ট তখন দরকার হয় যখন স্টক শর্ট সেল করা হয়, আর সাধারণত সেসব মানুষদের দ্বারা ব্যবহৃত হয় যারা সাধারণত তাদের বিনিয়োগে লিভারেজ ব্যবহার করতে চায়, বরং সেসব মানুষের মতো নয় যারা সিকিউরিটির প্রাইসের সম্পূর্ণ ক্রয়ের মূল্য প্রদান করতে পারে না।

এছাড়াও, ইন্ডিভিজুয়াল রিটায়ারমেন্ট অ্যাকাউন্ট (আইআরএ) এর মার্জিনের স্টক ক্রয়ের জন্য, ইউনিফর্ম গিফট টু মাইনর অ্যাকাউন্ট (UGMA), ট্রাস্ট অথবা অন্য কোন জিম্মাদার অ্যাকাউন্টে মার্জিন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা যায় না; এসকল অ্যাকাউন্টে ক্যাশ ডিপোজিটের প্রয়োজন হয়। তারসাথে, যতক্ষণ পর্যন্ত না ২ হাজার সমপরিমাণের স্টক ক্রয় করা হবে; ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিং (আইপিও) এর সময় স্টক ক্রয় করার সময়; সেসকল স্টক যার প্রতি শেয়ার ৫ এর কমে ট্রেড হচ্ছে; অথবা নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ অথবা জাতীয় মার্কেট NASDAQ ততোক্ষণ পর্যন্ত মার্জিন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা যাবে না।

যদিও উচ্চ লিভারেজের মার্জিন সম্ভাব্য লাভের ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়, তারপরও ট্রেডারদের সতর্ক থাকা উচিত ও ট্রেডে এন্ট্রি নেওয়ার আগে এটা ব্যবহারের ঝুঁকি এবং খরচ সম্পর্কে বিবেচনা করা উচিত।

অর্থসূচক/এমআই/কেএসআর