গুজব ছড়িয়ে যুবককে পিটিয়ে হত্যা: আলেমদের সঙ্গে প্রশাসনের বৈঠক

0
62

কোরআন অবমাননার গুজব ছড়িয়ে লালমনিরহাটের বুড়িমারীতে যুবক শহিদুন্নবী জুয়েলকে পিটিয়ে হত্যা করে মরদেহ আগুনে পোড়ানোর ঘটনায় আলেম সমাজের সঙ্গে বৈঠক করেছে প্রশাসন। শনিবার (৩১ অক্টোবর) দুপুরে পাটগ্রাম উপজেলা পরিষদের শহীদ আফজাল হল কক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

এর আগে ২৯ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) বিকেলে পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত যুবক শহিদুন্নবী জুয়েল রংপুর শহরের শালবন মিস্ত্রীপাড়া এলাকার আব্দুল ওয়াজেদ মিয়ার ছেলে। তিনি রংপুর ক্যান্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক গ্রন্থাগারিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র। গত বছর চাকরিচ্যুত হওয়ায় মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন।

বৈঠকে রংপুর বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল ওহাব ভূঞা, পুলিশের রংপুর রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) দেবদাশ ভট্টাচার্য্য, জেলা প্রশাসক (ডিসি) আবু জাফর, পুলিশ সুপার (এসপি) আবিদা সুলতানা, পাটগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান রুহুল আমিন বাবুল, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কামরুন নাহার, পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুমন কুমার মোহন্ত উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে ওই উপজেলার ইমাম মুয়াজ্জিনসহ পাঁচ শতাধিক আলেম উপস্থিত থেকে বুড়িমারী মসজিদের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। গুজব না ছড়িয়ে তদন্ত সংস্থা ও প্রশাসনকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করার জন্য আলেম সমাজের প্রতি আহ্বান জানান প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা।

বৈঠক শেষে নিহত জুয়েলের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে বিশেষ মুনাজাত করা হয়।

ঘটনার বর্ননায় পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, শহিদুন্নবী জুয়েল বৃহস্পতিবার বিকেলে সুলতান যোবাইয়ের আব্দার নামে একজন সঙ্গীসহ বুড়িমারী বেড়াতে আসেন। বিকেলে বুড়িমারী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে আসরের নামাজ আদায় করেন তারা।

নামাজ শেষে পাঠ করার জন্য মসজিদের সানসেটে রাখা কোরআন শরীফ নামাতে গিয়ে অসাবধনাতাবশত কয়েকটি কোরআন ও হাদিসের বই তার তার পায়ের ওপর পড়ে যায়। এ সময় তুলে চুম্বনও করেন জুয়েল। বিষয়টি নিয়ে তার সঙ্গে মুয়াজ্জিনের কথা কাটাকাটি হয়। এরপর আশপাশের লোকজন ছুটে এসে সন্দেহবশত জুয়েল ও সুলতান যোবাইয়েরকে পাশে ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের একটি কক্ষে আটকে রাখে। খবর পেয়ে পাটগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনও, ওসি বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদে উপস্থিত হন।

সন্ধ্যায় পুরো বাজারে এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, কোরআন অবমাননার দায়ে দুই যুবককে আটক করা হয়েছে। এ সময় উত্তেজিত হয়ে বিক্ষুব্ধ জনতা ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের দরজা জানালা ভেঙে প্রশাসনের কাছ থেকে জুয়েলকে ছিনিয়ে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। পরে মরদেহ টেনে পাটগ্রাম বুড়িমারী মহাসড়কে নিয়ে আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা মহাসড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করে।

সন্ধ্যা থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পাটগ্রাম ও হাতীবান্ধা থানা পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দফায় দফায় চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতার ছোড়া ইট পাথরের আঘাতে পাটগ্রাম থানার ওসি সুমন্ত কুমার মোহন্তসহ ১০ জন পুলিশ সদস্য আহত হন। জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে ১৭ রাউন্ড ফাঁকাগুলি ছোড়ে পুলিশ।

রাত সাড়ে ১০টার দিকে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর ও পুলিশ সুপার (এসপি) আবিদা সুলতানা অতিরিক্ত পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। নিহত জুয়েলের সঙ্গী সুলতান যোবাইয়েরকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছে পুলিশ। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি র‌্যাবের সদস্যরা টহল অব্যাহত রেখেছেন।

এদিকে ঘটনাটি তদন্তে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট টিএমএ মমিনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী তিন দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। অপরদিকে র‍্যাবের পক্ষ থেকেও ছায়া তদন্ত করা হচ্ছে।

বৈঠক শেষে রংপুর রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) দেবদাস ভট্টাচার্য্য সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, এ ঘটনায় পৃথক তিনটি মামলা হচ্ছে এবং কিছু আসামিকে শনাক্ত করা হয়েছে। অন্যদেরও শনাক্তের কাজ চলছে। এ ঘটনায় যারা যতটুকু অপরাধী তাদের ততটুকু শাস্তির আওতায় আনা হবে। বাহিরাগত বা বিশেষ কোনো দলের লোক সম্পৃক্ত কি-না সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শনাক্ত আসামিদের গ্রেফতার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

রংপুর বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল ওহাব ভূঞা সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ঘটনায় দোষীরা কেউ ছাড় পাবে না। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান বলেছেন- ‘তিনি উপস্থিতদের অনেককেই চিনেন না’। সুতরাং এসব বহিরাগত কারা এবং কীভাবে এসেছেন সব কিছুই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

অর্থসূচক/এমএস