বুকে গুলি করব, পিঠ দিয়ে বের হবে: পুলিশ সদস্যদের আকবরের হুমকি

0
118

সিলেটের বন্দরবাজার ফাঁড়িতে মো. রায়হান আহমদকে ধরে এনে নির্যাতনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দুই পুলিশ সদস্যকে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে বলেছিলেন বরখাস্ত হওয়া এসআই আকবর হোসেন ভূঞা। সত্য কথা বললে ‘বুকে গুলি করব, পিঠ দিয়ে বের হবে’ বলে হুমকি দিয়েছিলেন তিনি।

ঘটনার দিন (১০ অক্টোবর) মধ্যরাত থেকে পরদিন ভোর পর্যন্ত ফাঁড়িতে সেন্ট্রি পোস্টে কর্তব্যরত তিনজন কনস্টেবল শামীম মিয়া, সাইদুর রহমান ও দেলোয়ার হোসেন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। এর মধ্যে সাইদুর ও দেলোয়ারকে আকবর মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে বলেছিলেন বলে তারা জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন।

পুলিশ সূত্র জানায়, ১০ অক্টোবর বন্দরবাজার ফাঁড়িতে তুলে নিয়ে নির্যাতন করা হয় রায়হানকে। ঘটনা আড়াল করতে ফাঁড়ির ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার চিত্র গায়েব করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। তবে ফাঁড়ির পাশে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সিসি ক্যামেরার চিত্রে রায়হানকে ফাঁড়িতে নিয়ে আসা ও ভোরবেলা হাসপাতালে ভর্তি করতে নিয়ে যাওয়ার চিত্র ধরা পড়ে। এই চিত্র নিয়ে নগর পুলিশের একটি অনুসন্ধান কমিটি তদন্ত করে ফাঁড়ির ইনচার্জ আকবরসহ নির্যাতনে সাত পুলিশ জড়িত থাকার প্রমাণ পায়।

১২ অক্টোবর আকবরসহ চারজনকে বরখাস্ত ও তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়। বরখাস্ত হওয়ার পর থেকে আকবরকে পাওয়া যাচ্ছে না। বাকি তিনজন বরখাস্তের মধ্যে কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাসকে ২০ অক্টোবর গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পিবিআই। ২১ অক্টোবর ফাঁড়ির সিসি ক্যামেরার চিত্র নষ্ট করা ও আকবরকে পালাতে সহায়তা করার দায়ে ‘টুইআইসি’ পদে থাকা এসআই হাসান উদ্দিনকে বরখাস্ত করা হয়।

জবানবন্দিতে কনস্টেবল সাইদুর রহমান যা বলেছেন
ঘটনার দিন রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত ফাঁড়ির সেন্ট্রি ডিউটিতে ছিলেন সাইদুর রহমান। জবানবন্দিতে তিনি বলেছেন, রায়হানকে থানায় ধরে নিয়ে আসা এবং নির্যাতনের ঘটনা তিনি দেখেছেন। ফাঁড়ির সেন্ট্রি পোস্ট থেকে তিনি রায়হানের চিৎকার শুনতে পেয়ে রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখেন, কনস্টেবল হারুন রায়হানের দুই পা উঁচু করে ধরে রেখেছেন, আকবর ও টিটু লাঠি দিয়ে লোকটির পায়ের পাতায় আঘাত করছেন। তিনি মারধরের কারণ জানতে চাইলে এসআই আকবর বলেন, ‘সে একজন ছিনতাইকারী। সঙ্গে থাকা দুজনের নাম জানতে জিজ্ঞাসাবাদ করছি।’ এ সময় পাশ থেকে এএসআই আশেক এলাহি বলেন, ‘সে পুলিশের সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করেছে। পায়ে মারেন, পায়ে মারেন…সমস্যা নাই।’ এ অবস্থায় আকবর সাইদুরকে ধমক দিয়ে সেন্ট্রি পোস্টে ডিউটিতে যেতে বলেন। এরপর তিনি ডিউটিরত অবস্থায় বেশ কয়েকবার রায়হানের চিৎকার শোনেন।

জবানবন্দিতে সাইদুর বলেছেন, ‘পরদিন দুপুর সাড়ে ১২টায় ফাঁড়িতে ডিসি (উপকমিশনার) স্যার আসবেন বলে আমাকে আসতে বলা হয়। আকবর স্যার তখন আমাকে বলেন, “ডিসি স্যার জানতে চাইলে বলবা রাতে ফাঁড়িতে কোনো লোক এনে নির্যাতন করা হয় নাই। সে (রায়হান) কাস্টঘর থেকে গণপিটুনি খেয়ে ধরা পড়েছে, তাকে (রায়হান) সরাসরি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।” এই কথা বলে আকবর স্যার হুমকি দেন। আকবর স্যার বলেন, “আমি যা বলব, তাই বলবে। সত্য কথা বললে বুকে গুলি করব, পিঠ দিয়ে বের হবে।” এই হুমকি দিয়ে আকবর স্যার আমার বুকে হাত বুলান।’

দেলোয়ার হোসেন যা বলেছেন
১১ অক্টোবর ভোর ৪টার সময় কনস্টেবল সাইদুরের কাছ থেকে সেন্ট্রি পোস্টের ডিউটি বুঝে নেন দেলোয়ার হোসেন। তখন সাইদুর তাকে জানান ছিনতাইকারী একজন ধরে এনে মারধর করা হয়েছে। এ সময় এসআই আকবর ও অন্যদের সঙ্গে ছিনতাইয়ের শিকার হওয়া লোকটিও ছিলেন। ঘটনাটি ফাঁড়ির মুন্সির কার্যালয়ের কক্ষে হয়।

দেলোয়ার হোসেন মুন্সির কক্ষের দরজার কাছে গিয়ে দেখেন, এসআই আকবরের হাতে একটি মোটা লাঠি। তিনি চেয়ারে বসা। তার পায়ের কাছে হাতকড়া পরা এক লোক। সেখানে পুলিশের সঙ্গে অজ্ঞাত একজন লোক ও তার সঙ্গে আরও একজন লোককে দেখতে পান। দেলোয়ারকে দেখে আকবর বলেন, ‘তুমি সামনে চলে যাও।’ তখন তিনি সেন্ট্রি পোস্টে ডিউটিতে যান।

ঘটনার বর্ণনায় দেলোয়ার বলেন, এরপর কনস্টেবল তৌহিদ তার কাছে আসেন। আকবর তখন তৌহিদকে ডেকে ভেতরে নিয়ে যান। আকবর তৌহিদের মুঠোফোন থেকে গ্রেপ্তার হওয়া লোকটির (রায়হান) বাড়িতে ফোন দিয়ে ১০ হাজার টাকা নিয়ে আসতে বলেন। তৌহিদ ফোন দেওয়ার পর দেলোয়ার তার কাছে জানতে চান, টাকা কেন নিয়ে আসতে বলেছেন? তখন তৌহিদ বলেন, ‘আকবর স্যার বলেছেন, ছিনতাইয়ের টাকা উদ্ধার দেখাতে ফোন দেওয়া হয়।’ এরপর আকবর এএসআই আশেক এলাহিকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আমি ঘুমিয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পর তাঁকে (রায়হান) হাসপাতালে নিয়ে যেও।’ ভোর পাঁচটার দিকে আশেক এলাহি ও কনস্টেবল হারুন লোকটিকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে হাসপাতালে রওনা করার প্রস্তুতি নেন। তারা রওনা দেওয়ার পর আকবরও তাড়াতাড়ি ফাঁড়ি থেকে বের হয়ে যান। এরপর দেলোয়ারের ডিউটি শেষ হলে কনস্টেবল ইলিয়াছকে ডিউটি বুঝিয়ে দিয়ে ঘুমাতে চলে যান।

দেলোয়ার জবানবন্দিতে বলেন, ‘আমি দুপুর ১২টায় ঘুম থেকে উঠে শুনি লোকটি (রায়হান) মারা গেছেন। তখন ফাঁড়িতে ফিরে এসে আকবর স্যার আমাকে বলেন, “ফাঁড়িতে কোনো টর্চারিংয়ের ঘটনা ঘটে নাই। ওই লোক (রায়হান) কাস্টঘর এলাকায় গণধোলাইয়ে মারা গেছে।” এ কথা বলে আকবর স্যার আমাকে হুমকি দিয়ে বলেন, “যদি এই কথা না বলিস, তাহলে বুকে গুলি করব, পিঠ দিয়ে বের হবে।”

উল্লেখ্য, গত ১০ অক্টোবর দিবাগত রাতে সিলেট মহানগর পুলিশের কোতোয়ালি থানাধীন বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে পুলিশের নির্যাতনের শিকার হন রায়হান আহমদ। পরদিন সকালে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি মারা যান। রায়হান সিলেট নগরের আখালিয়ার নেহারিপাড়ার মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে। নগরের রিকাবিবাজার স্টেডিয়াম মার্কেটে এক চিকিৎসকের চেম্বারে চাকরি করতেন।

এ ঘটনায় ১২ অক্টোবর রাত আড়াইটার দিকে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে হেফাজতে মৃত্যু আইনে সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা করেন রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি।

অর্থসূচক/কেএসআর